৬ হাজার ৮০০ সৌরবাতির অধিকাংশই অকেজো, বাজারদরের দ্বিগুণে কেনার অভিযোগ
আক্কাস আলী খান রাজবাড়ী প্রতিনিধি,
রাজবাড়ীর পাঁচ উপজেলায় গ্রামীণ সড়ক, হাট-বাজার, গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বিদ্যালয় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আশপাশ আলোকিত করতে প্রায় ৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয়েছিল প্রায় ৬ হাজার ৮০০টি সৌরবাতি। স্থাপনের কয়েক বছরের মধ্যেই এসব বাতির অধিকাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা। ফলে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ে বাস্তবায়িত আলোককরণ প্রকল্পটি অনেক এলাকায় অন্ধকারেই পড়ে আছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজারে প্রায় ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা মূল্যের সৌরবাতি ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয়েছে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং যথাযথ তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিপুলসংখ্যক বাতি অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা-কাবিটা) ও গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতায় ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত রাজবাড়ীর পাঁচ উপজেলায় এসব সৌরবাতি স্থাপন করা হয়। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয়।
তথ্য অনুযায়ী, রাজবাড়ী সদর উপজেলায় চার অর্থবছরে ১১ কোটি ৮৫ লাখ ৭১ হাজার ৭৩০ টাকা ব্যয়ে ২ হাজার ১৫৫টি সৌরবাতি স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩ কোটি ৭ লাখ ২৩ হাজার ২৩২ টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩ কোটি ২৯ লাখ ২৬ হাজার ৮৮ টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ কোটি ৮৩ লাখ ৯৯ হাজার ৬৮৩ টাকা এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২ কোটি ৬৫ লাখ ২২ হাজার ৭২৭ টাকা ব্যয় করা হয়।
পাংশা উপজেলায় ৭ কোটি ৭১ লাখ ৪৯ হাজার ২১৭ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ৪০০টি, গোয়ালন্দ উপজেলায় ৭ কোটি ১১ লাখ ৩০ হাজার ৮৯৩ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ২৯৩টি, কালুখালী উপজেলায় ৫ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার ৩০৮ টাকা ব্যয়ে ১৯১টি এবং বালিয়াকান্দি উপজেলায় ৫ কোটি ৫৮ লাখ ৩৪ হাজার ৮৬৪ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ১৫টি সৌরবাতি স্থাপন করা হয়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, প্রতিটি সৌরবাতি স্থাপনে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, একই ধরনের সৌরবাতির বাজারমূল্য ছিল এর প্রায় অর্ধেক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বলেন, বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি দামে সৌরবাতি কেনা হয়েছে বলে তাদের জানা আছে। নির্ধারিত কোম্পানি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করায় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় মূলত বাতি স্থাপন করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করেই বিল পরিশোধ করেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তিন বছর বাতিগুলোর দেখভালের কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, বাতি স্থাপনের পর থেকেই বিভিন্ন স্থান থেকে নষ্ট হওয়ার অভিযোগ আসতে থাকে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় থেকে সেগুলো মেরামতের সুযোগ নেই।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সৌরবাতি স্থাপনের পর প্রথমদিকে গ্রামীণ জনপদের রাতের চিত্রই বদলে গিয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার ও মোড় আলোকিত থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। কিন্তু কয়েক মাস বা এক-দুই বছরের মধ্যেই অনেক বাতি নষ্ট হয়ে যায়। কোথাও কোথাও স্থাপনের ছয় মাসের মধ্যেই বাতি অচল হয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।
কালুখালী উপজেলার মাজবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী শরিফুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন ইউনিয়নের মোড়, হাট-বাজার, বিদ্যালয়, মসজিদ ও মন্দিরের সামনে সৌরবাতি স্থাপন করা হয়েছিল। বাতি জ্বলার সময় এলাকাগুলো অনেকটা শহরের মতো মনে হতো। পরে একে একে বাতিগুলো বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়রা সংস্কারের জন্য একাধিকবার অনুরোধ করলেও কাজ হয়নি। বর্তমানে অধিকাংশ বাতির ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেছে।
রাজবাড়ীর খানখানাপুর বাজারের ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান বলেন, বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সৌরবাতি স্থাপন করা হয়েছিল। এখন দিন যত যাচ্ছে, ততই বাতি নষ্ট হচ্ছে। অধিকাংশ বাতিই আর জ্বলে না। ফলে যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, তা অনেকটা ব্যর্থ হয়েছে।
ব্যবসায়ী মনোয়ার হোসেন ও এনামুল হকসহ কয়েকজন বলেন, প্রায় ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা সৌরবাতির বাজারমূল্য ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে ছিল বলে তারা জানেন। তাদের অভিযোগ, বেশি দামে নিম্নমানের বাতি স্থাপনের কারণেই অল্প সময়ের মধ্যে সেগুলো নষ্ট হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বালিয়াকান্দি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কোহিনুর জাহান বলেন, “এ প্রকল্প অনেক আগের। নতুন করে এখনো কোনো আলোককরণ প্রকল্প পাওয়া যায়নি। তবে পুরনো বাতিগুলো সচল করা যায় কি না, সে বিষয়টি সভায় উপস্থাপন করা হবে।”
বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মুরাদ ইসলাম বলেন, উপজেলা শহর ছাড়াও বিভিন্ন ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সৌরবাতিগুলো স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশই এখন নষ্ট। তিন বছর পার হয়ে যাওয়ায় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় থেকে এগুলো মেরামত বা সংস্কারের সুযোগ নেই। পুরনো বাতিগুলো সচল করতে নতুন কোনো প্রকল্প নেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সৌরবাতি প্রকল্পের সুফল ধরে রাখতে হলে শুধু বাতি স্থাপন করলেই হবে না; মানসম্মত প্যানেল, ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও বাতির মান নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোও যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ আলম হোসেন
Copyright © 2026 অন্যায়ের প্রতিবাদ. All rights reserved.