০১:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

করোনা আক্রান্তের সাহায্যে নিজেকে উজার করে দিয়েছেন চুয়াডাঙ্গার মাসুদ রানা

সারাবাংলা২৪নিউজ ডেস্ক,ঢাকা
  • প্রকাশ : ০৮:৫০:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২০
  • / 38

অনলাইন ডেস্ক
চুয়াডাঙ্গার মাসুদ রানা পেশায় অ্যাম্বুল্যান্স চালক। করোনাকালে কখনো নমুনা সংগ্রহের জন্য, কখনো বা চুয়াডাঙ্গা থেকে সংকটাপন্ন রোগী নিয়ে ছুটে যান রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গার হাসপাতালে। এ জন্য মানুষের কথাও কম শুনতে হয়নি।
বাড়ি ছিল চুয়াডাঙ্গার সদর উপজেলার বেলগাছিতে। পেশাগত কারণে হাসপাতালের কাছাকাছি থাকা দরকার। এ জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের পেছনে দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় বাসা নিয়েছেন। বয়স ২৬ বছর।
ব্যক্তিমালিকাধীন একটি অ্যাম্বুল্যান্স চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন রানা। বছর সাতেক ধরে অ্যাম্বুল্যান্স চালাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত তাঁকে অসুস্থ মানুষদের আনা-নেওয়া করতে হয়। কখনো ঢাকা, কখনো রাজশাহী ছুটতে হয় মুমূর্ষু রোগী নিয়ে। অসুস্থ মানুষের কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা আছে। কারণ অ্যাম্বুল্যান্স চালানোর আগেও রোগীদের নিয়েই কাজ ছিল রানার। একটি বেসরকারি ক্লিনিকে কাজ করতেন। এক্স-রে বিভাগে ডিউটি। ক্লিনিকে আসা কারো দরকার হলে এক্স-রে করে দিতেন। কিন্তু এক্স-রে রুমের পরিবেশে মন বসত না। যেদিন রাতে ডিউটি থাকত, সেদিন দিনে অ্যাম্বুল্যান্স চালনা প্র্যাকটিস করতেন। এভাবে একসময় অ্যাম্বুল্যান্স চালানো আয়ত্তে আসে। লাইসেন্সও পেয়ে যান। একসময় ক্লিনিকের কাজ ছেড়ে অ্যাম্বুল্যান্স চালানোকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন।
চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, অ্যাম্বুল্যান্সচালক হিসেবে আগে থেকেই স্বাস্থ্য বিভাগের অনেকের কাছে পরিচিত ছিলেন রানা। সেই সূত্রে এই মহামারির সময় নিজেকে মানুষের সেবায় কাজে লাগিয়েছেন রানা। চুয়াডাঙ্গায় প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ১৯ মার্চ। ১০ এপ্রিল জেলা সিভিল সার্জনের অফিস থেকে রানার ডাক আসে। সিভিল সার্জন অফিসের পূর্বপরিচিত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন তো জরুরি সময়। অনেকে ভয়ের মধ্যে আছে। মানুষকে হাসপাতালে আনা-নেওয়া কিংবা করোনার নমুনা সংগ্রহের কাজে তোমাকে দরকার।’ এই সময় মানুষের জন্য কিছু করা যাবে ভেবে রাজি হয়ে যান। সেই থেকে সিভিল সার্জন অফিসের নির্দেশনা মোতাবেক নমুনা সংগ্রহের জন্য রানার অ্যাম্বুুল্যান্স ছুটে চলছে জেলার আনাচে-কানাচে। ২১ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গা থেকে এক করোনা রোগী নিয়ে ঢাকা গিয়েছেন রানা। বললেন, ‘সেদিন বিকেলেই আমাকে জানানো হলো, চুয়াডাঙ্গার এক রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন। জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে। যা হোক, অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে ছুটে গেলাম সদর উপজেলার বড় সলুয়া। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এই গ্রামেরই ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। জলদি করে অ্যাম্বুল্যান্সে উঠিয়ে তাঁকে নিয়ে রওনা দিই রাজধানীর উদ্দেশে। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ১২টা বেজে যায়।’
অ্যাম্বুল্যান্সে করেই রোগী আনা-নেওয়া করেন মাসুদ রানা। শুধু রোগী বহন নয়, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির শেষবিদায়েও অংশ নিয়েছেন রানা। ১ মে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বলদিয়া গ্রামের এক যুবক করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান। ওই দিনই নিজের অ্যাম্বুল্যান্সে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে সেখানে যান রানা। ওই ব্যক্তির দাফনকাজ শেষ করে তবে ফেরেন। রানা বললেন, ‘করোনার কাজে যখন যেখানেই গেছি, দেখেছি মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম। অনেক সময় করোনা রোগী দেখার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সের কাছে ভিড় করে মানুষ। অনেক সময় তাদের সামাল দিতেও বেগ পেতে হয়েছে।’ করোনাকালে কাজের জন্য জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে পিপিই দেওয়া হয়েছে রানাকে। রোগী নিয়ে যাওয়ার আগে ও পরে জীবাণুনাশক দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে।
রানা বলেন, ‘করোনা রোগীর কাজ করতে আমার অসুবিধা না থাকলেও আপত্তি ছিল অনেকের। এলাকার লোকজন, পরিচিতরা না করেছেন। বলেছেন, এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। করার দরকার নেই। তার পরও এই কাজ শুরু করেছি। আমার তো পেশাই অ্যাম্বুল্যান্স চালানো। করোনার কথা বাদ দিলেও সব সময়ই তো দুর্ঘটনার ভয় থাকে। ফলে এ সময় কাপুরুষের মতো বসে থাকলে চলবে কেন? পিপিই পরে গাড়ি চালিয়েছি। আমার কোনো ভয় ছিল না। কিন্তু চারপাশের মানুষ আমাকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি।’
অ্যাম্বুল্যান্সে করে করোনা রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন বলে প্রতিনিয়ত নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন রানা। এই যেমন—গেল ঈদের দিন বাড়ির দরজায় অ্যাম্বুল্যান্স রেখে ভেতরে গিয়েছিলেন রানা। কিন্তু প্রতিবেশী এসে গোলযোগ বাধিয়ে দেয়। তেড়ে তাঁকে মারতে আসে। তবু এই কাজ থেকে পিছপা হননি। বললেন, ‘ঈদের দিনও আমাকে নানাজনের কটু কথা শুনতে হয়েছে। শুনতে খারাপ লাগলেও এসব এখন আর পাত্তা দিই না। বিপদে মানুষের ডাকে সাড়া দেওয়াই কাজ। এ কাজ থেকে কখনো পিছু হটব না।’
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. এ এস এফ মারুফ হাসান বলেন, ‘মাসুদ রানা তাঁর কাজে খুবই আন্তরিক। করোনার কোনো কাজে তাঁর কাছ থেকে না শুনিনি। কাজে ফাঁকি দেওয়ার জন্য অজুহাত দাঁড় করানো রানার মধ্যে নেই।
>আমার সাথে রাজনৈতিক ভাবে অনেক কাজ ও সময় দিয়েছে এই রানা।
আল্লাহ তোমাকে সুস্থ ও ভালো রাখুক দোয়া করি।
 
লেখক
মোঃ জানিফ
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখা।        

Please Share This Post in Your Social Media

করোনা আক্রান্তের সাহায্যে নিজেকে উজার করে দিয়েছেন চুয়াডাঙ্গার মাসুদ রানা

প্রকাশ : ০৮:৫০:০০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২০

অনলাইন ডেস্ক
চুয়াডাঙ্গার মাসুদ রানা পেশায় অ্যাম্বুল্যান্স চালক। করোনাকালে কখনো নমুনা সংগ্রহের জন্য, কখনো বা চুয়াডাঙ্গা থেকে সংকটাপন্ন রোগী নিয়ে ছুটে যান রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গার হাসপাতালে। এ জন্য মানুষের কথাও কম শুনতে হয়নি।
বাড়ি ছিল চুয়াডাঙ্গার সদর উপজেলার বেলগাছিতে। পেশাগত কারণে হাসপাতালের কাছাকাছি থাকা দরকার। এ জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের পেছনে দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় বাসা নিয়েছেন। বয়স ২৬ বছর।
ব্যক্তিমালিকাধীন একটি অ্যাম্বুল্যান্স চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন রানা। বছর সাতেক ধরে অ্যাম্বুল্যান্স চালাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত তাঁকে অসুস্থ মানুষদের আনা-নেওয়া করতে হয়। কখনো ঢাকা, কখনো রাজশাহী ছুটতে হয় মুমূর্ষু রোগী নিয়ে। অসুস্থ মানুষের কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা আছে। কারণ অ্যাম্বুল্যান্স চালানোর আগেও রোগীদের নিয়েই কাজ ছিল রানার। একটি বেসরকারি ক্লিনিকে কাজ করতেন। এক্স-রে বিভাগে ডিউটি। ক্লিনিকে আসা কারো দরকার হলে এক্স-রে করে দিতেন। কিন্তু এক্স-রে রুমের পরিবেশে মন বসত না। যেদিন রাতে ডিউটি থাকত, সেদিন দিনে অ্যাম্বুল্যান্স চালনা প্র্যাকটিস করতেন। এভাবে একসময় অ্যাম্বুল্যান্স চালানো আয়ত্তে আসে। লাইসেন্সও পেয়ে যান। একসময় ক্লিনিকের কাজ ছেড়ে অ্যাম্বুল্যান্স চালানোকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন।
চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, অ্যাম্বুল্যান্সচালক হিসেবে আগে থেকেই স্বাস্থ্য বিভাগের অনেকের কাছে পরিচিত ছিলেন রানা। সেই সূত্রে এই মহামারির সময় নিজেকে মানুষের সেবায় কাজে লাগিয়েছেন রানা। চুয়াডাঙ্গায় প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ১৯ মার্চ। ১০ এপ্রিল জেলা সিভিল সার্জনের অফিস থেকে রানার ডাক আসে। সিভিল সার্জন অফিসের পূর্বপরিচিত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন তো জরুরি সময়। অনেকে ভয়ের মধ্যে আছে। মানুষকে হাসপাতালে আনা-নেওয়া কিংবা করোনার নমুনা সংগ্রহের কাজে তোমাকে দরকার।’ এই সময় মানুষের জন্য কিছু করা যাবে ভেবে রাজি হয়ে যান। সেই থেকে সিভিল সার্জন অফিসের নির্দেশনা মোতাবেক নমুনা সংগ্রহের জন্য রানার অ্যাম্বুুল্যান্স ছুটে চলছে জেলার আনাচে-কানাচে। ২১ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গা থেকে এক করোনা রোগী নিয়ে ঢাকা গিয়েছেন রানা। বললেন, ‘সেদিন বিকেলেই আমাকে জানানো হলো, চুয়াডাঙ্গার এক রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন। জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে। যা হোক, অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে ছুটে গেলাম সদর উপজেলার বড় সলুয়া। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এই গ্রামেরই ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। জলদি করে অ্যাম্বুল্যান্সে উঠিয়ে তাঁকে নিয়ে রওনা দিই রাজধানীর উদ্দেশে। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত ১২টা বেজে যায়।’
অ্যাম্বুল্যান্সে করেই রোগী আনা-নেওয়া করেন মাসুদ রানা। শুধু রোগী বহন নয়, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির শেষবিদায়েও অংশ নিয়েছেন রানা। ১ মে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বলদিয়া গ্রামের এক যুবক করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান। ওই দিনই নিজের অ্যাম্বুল্যান্সে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে সেখানে যান রানা। ওই ব্যক্তির দাফনকাজ শেষ করে তবে ফেরেন। রানা বললেন, ‘করোনার কাজে যখন যেখানেই গেছি, দেখেছি মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম। অনেক সময় করোনা রোগী দেখার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সের কাছে ভিড় করে মানুষ। অনেক সময় তাদের সামাল দিতেও বেগ পেতে হয়েছে।’ করোনাকালে কাজের জন্য জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে পিপিই দেওয়া হয়েছে রানাকে। রোগী নিয়ে যাওয়ার আগে ও পরে জীবাণুনাশক দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স জীবাণুমুক্ত করা হয়েছে।
রানা বলেন, ‘করোনা রোগীর কাজ করতে আমার অসুবিধা না থাকলেও আপত্তি ছিল অনেকের। এলাকার লোকজন, পরিচিতরা না করেছেন। বলেছেন, এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। করার দরকার নেই। তার পরও এই কাজ শুরু করেছি। আমার তো পেশাই অ্যাম্বুল্যান্স চালানো। করোনার কথা বাদ দিলেও সব সময়ই তো দুর্ঘটনার ভয় থাকে। ফলে এ সময় কাপুরুষের মতো বসে থাকলে চলবে কেন? পিপিই পরে গাড়ি চালিয়েছি। আমার কোনো ভয় ছিল না। কিন্তু চারপাশের মানুষ আমাকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি।’
অ্যাম্বুল্যান্সে করে করোনা রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন বলে প্রতিনিয়ত নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন রানা। এই যেমন—গেল ঈদের দিন বাড়ির দরজায় অ্যাম্বুল্যান্স রেখে ভেতরে গিয়েছিলেন রানা। কিন্তু প্রতিবেশী এসে গোলযোগ বাধিয়ে দেয়। তেড়ে তাঁকে মারতে আসে। তবু এই কাজ থেকে পিছপা হননি। বললেন, ‘ঈদের দিনও আমাকে নানাজনের কটু কথা শুনতে হয়েছে। শুনতে খারাপ লাগলেও এসব এখন আর পাত্তা দিই না। বিপদে মানুষের ডাকে সাড়া দেওয়াই কাজ। এ কাজ থেকে কখনো পিছু হটব না।’
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. এ এস এফ মারুফ হাসান বলেন, ‘মাসুদ রানা তাঁর কাজে খুবই আন্তরিক। করোনার কোনো কাজে তাঁর কাছ থেকে না শুনিনি। কাজে ফাঁকি দেওয়ার জন্য অজুহাত দাঁড় করানো রানার মধ্যে নেই।
>আমার সাথে রাজনৈতিক ভাবে অনেক কাজ ও সময় দিয়েছে এই রানা।
আল্লাহ তোমাকে সুস্থ ও ভালো রাখুক দোয়া করি।
 
লেখক
মোঃ জানিফ
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখা।