১০:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে ৯১ লাখ টাকা আত্মসাৎ: পোস্টমাস্টারসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

আক্কাস আলী খান রাজবাড়ী প্রতিনিধি।
  • প্রকাশ : ০২:৪৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
  • / 2

আক্কাস আলী খান রাজবাড়ী প্রতিনিধি।

প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে সাদা কাগজে দাপ্তরিক সিল ব্যবহার করে ৬১ জন গ্রাহকের প্রায় ৯১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ সাতজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের হয়েছে।

রোববার (০২ আগস্ট) রাজবাড়ীর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে কুষ্টিয়া বিভাগের পোস্ট অফিস পরিদর্শক (প্রশাসন) মোঃ শহিদুল ইসলাম মামলাটি দায়ের করেন।

মামলার অভিযুক্তরা হলেন— রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র, সদর উপজেলার বাঘিয়া গ্রামের আয়ুব আলী মৃধার ছেলে লেটার রাইটার শিহাব মৃধা, তার ভাই পিএলআই এজেন্ট মাহবুব হাসান মৃধা, অফিস সহায়ক রেজাউল আলম, তৎকালীন ট্রেজারার নাজমুল হাসান, পোস্টাল অপারেটর মোঃ গোলাম মোস্তফা বাচ্চু এবং পোস্টাল অপারেটর প্রণব কুমার সরকার।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা পরস্পরের যোগসাজশে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৬১ জন গ্রাহকের ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের আমানতের মোট ৯১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। পরে শিহাব মৃধার মা শিউলী বেগম গত ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকারনামা দিলেও পরবর্তীতে তা বাস্তবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানান।

রাজবাড়ী জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট বিজন কুমার ঘোষ জানান, আদালত মামলাটি গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশ পরে দেওয়া হবে।

এর আগে গত ৩০ জুলাই একই ঘটনায় ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পক্ষে নাছরিন আক্তার বাদী হয়ে রাজবাড়ীর অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর আমলি আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় আদালত পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে সমন জারির নির্দেশ দেন।

ওই মামলার অভিযোগে বলা হয়, পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় লেটার রাইটার শিহাব মৃধা ডাকঘরে সঞ্চয় হিসাব খোলার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে সাদা স্লিপে টাকা সংগ্রহ করে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন। ওই মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মাহবুব মৃধা, মাহবুবুর রহমান, নাজমুল হাছান, পবিত্র কুমার সরকার, রেজাউল আলম, গোলাম মোস্তফা বাচ্চু, এস এম নুরুজ্জামান, আসমা আক্তার, বিউটি রানী দাস, নুরুল মাসুদ ও রোকসানা আক্তার।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ জুলাই কুষ্টিয়া বিভাগীয় ডাক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা তদন্তে এসে অভিযোগের মূল অভিযুক্ত শিহাব মৃধাকে ডাকঘরে পেলেও তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করেননি। এরপর থেকেই তিনি পলাতক। ভুক্তভোগীরা তাদের আমানতের টাকা ফেরতের দাবিতে নিয়মিত ডাকঘরে ভিড় করছেন।

এদিকে, ঘটনার পর রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের তৎকালীন পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রকে কুষ্টিয়ায় বদলি করা হয়েছে।

ঘটনার তদন্তে গত ১৬ জুলাই খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদের স্বাক্ষরিত এক আদেশে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিধি-বিধানের কোনো ঘাটতি বা পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে সরকারি ক্ষতি হয়ে থাকলে তা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়েছে।

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের নবাগত পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ বলেন, “আমি গত ৬ জুলাই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। যোগদানের পর বিষয়টি জানতে পেরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি। তাদের পরামর্শে থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গেলে পুলিশ মামলা করার পরামর্শ দেয়। পরে বিষয়টি কুষ্টিয়া বিভাগীয় কার্যালয় এবং খুলনা সার্কেল অফিসে জানানো হয়। বর্তমানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও জানান, শিহাব মৃধা সরকারি কর্মচারী নন। ২০২১ সাল থেকে তিনি ‘হেল্পিং হ্যান্ড’ হিসেবে লেটার রাইটারের দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, মেয়াদি সঞ্চয় হিসাব খোলার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে তিনি প্রায় অর্ধশত গ্রাহকের প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। গ্রাহকরা সঞ্চয় হিসাবের বই না পাওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

Please Share This Post in Your Social Media

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে ৯১ লাখ টাকা আত্মসাৎ: পোস্টমাস্টারসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশ : ০২:৪৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

আক্কাস আলী খান রাজবাড়ী প্রতিনিধি।

প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে সাদা কাগজে দাপ্তরিক সিল ব্যবহার করে ৬১ জন গ্রাহকের প্রায় ৯১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ সাতজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের হয়েছে।

রোববার (০২ আগস্ট) রাজবাড়ীর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতে কুষ্টিয়া বিভাগের পোস্ট অফিস পরিদর্শক (প্রশাসন) মোঃ শহিদুল ইসলাম মামলাটি দায়ের করেন।

মামলার অভিযুক্তরা হলেন— রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র, সদর উপজেলার বাঘিয়া গ্রামের আয়ুব আলী মৃধার ছেলে লেটার রাইটার শিহাব মৃধা, তার ভাই পিএলআই এজেন্ট মাহবুব হাসান মৃধা, অফিস সহায়ক রেজাউল আলম, তৎকালীন ট্রেজারার নাজমুল হাসান, পোস্টাল অপারেটর মোঃ গোলাম মোস্তফা বাচ্চু এবং পোস্টাল অপারেটর প্রণব কুমার সরকার।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা পরস্পরের যোগসাজশে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৬১ জন গ্রাহকের ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের আমানতের মোট ৯১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। পরে শিহাব মৃধার মা শিউলী বেগম গত ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকারনামা দিলেও পরবর্তীতে তা বাস্তবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানান।

রাজবাড়ী জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট বিজন কুমার ঘোষ জানান, আদালত মামলাটি গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশ পরে দেওয়া হবে।

এর আগে গত ৩০ জুলাই একই ঘটনায় ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পক্ষে নাছরিন আক্তার বাদী হয়ে রাজবাড়ীর অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর আমলি আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় আদালত পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে সমন জারির নির্দেশ দেন।

ওই মামলার অভিযোগে বলা হয়, পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় লেটার রাইটার শিহাব মৃধা ডাকঘরে সঞ্চয় হিসাব খোলার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে সাদা স্লিপে টাকা সংগ্রহ করে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন। ওই মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মাহবুব মৃধা, মাহবুবুর রহমান, নাজমুল হাছান, পবিত্র কুমার সরকার, রেজাউল আলম, গোলাম মোস্তফা বাচ্চু, এস এম নুরুজ্জামান, আসমা আক্তার, বিউটি রানী দাস, নুরুল মাসুদ ও রোকসানা আক্তার।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ জুলাই কুষ্টিয়া বিভাগীয় ডাক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা তদন্তে এসে অভিযোগের মূল অভিযুক্ত শিহাব মৃধাকে ডাকঘরে পেলেও তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করেননি। এরপর থেকেই তিনি পলাতক। ভুক্তভোগীরা তাদের আমানতের টাকা ফেরতের দাবিতে নিয়মিত ডাকঘরে ভিড় করছেন।

এদিকে, ঘটনার পর রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের তৎকালীন পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্রকে কুষ্টিয়ায় বদলি করা হয়েছে।

ঘটনার তদন্তে গত ১৬ জুলাই খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদের স্বাক্ষরিত এক আদেশে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিধি-বিধানের কোনো ঘাটতি বা পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে সরকারি ক্ষতি হয়ে থাকলে তা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়েছে।

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের নবাগত পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ বলেন, “আমি গত ৬ জুলাই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। যোগদানের পর বিষয়টি জানতে পেরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি। তাদের পরামর্শে থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গেলে পুলিশ মামলা করার পরামর্শ দেয়। পরে বিষয়টি কুষ্টিয়া বিভাগীয় কার্যালয় এবং খুলনা সার্কেল অফিসে জানানো হয়। বর্তমানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও জানান, শিহাব মৃধা সরকারি কর্মচারী নন। ২০২১ সাল থেকে তিনি ‘হেল্পিং হ্যান্ড’ হিসেবে লেটার রাইটারের দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, মেয়াদি সঞ্চয় হিসাব খোলার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে তিনি প্রায় অর্ধশত গ্রাহকের প্রায় এক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। গ্রাহকরা সঞ্চয় হিসাবের বই না পাওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।