০৫:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এবারের নির্বাচনী কৌশল ও অভিনবত্ব আন্তর্জাতিক টেস্ট কেস: টিআইবি

নিজেস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
  • প্রকাশ : ১০:০৪:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৪
  • / 99

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘একপক্ষীয় ও পাতানো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ হয়েছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সংস্থাটি বলেছে, এবারের নির্বাচন অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। এ নির্বাচন দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।
বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ট্র্যাকিং’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। এতে নির্বাচন নিয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
টিআইবির মতে, এ নির্বাচনের ফলে গণতান্ত্রিক অবনমনের অভিজ্ঞতা এবং নির্বাচনী কৌশল ও অভিনবত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে বিবেচিত হবে।
নির্বাচনের আগে ও পরে ৫০ টি আসনের প্রার্থী ও নির্বাচনি পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে গবেষণাপত্র প্রকাশ করে টিআইবি। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রচারের জন্য প্রার্থীর নির্ধারিত ব্যয়সীমা ২৫ লাখ টাকা হলেও গড়ে একেক জন প্রার্থী প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ করেছেন। পাশাপাশি এই নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গন এবং শাসনব্যবস্থার ওপর ক্ষমতাসীনদলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
টিআইবির পক্ষ থেকে বলা হয়, ভোট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক দেখাতে নিজ দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়া হলেও বেশির ভাগ আসনে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিলো না ২৪১টি আসনের ভোট।
গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। এই ভোটে দলটি সংসদে ২২৩টি আসন পেয়েছে। আগের সংসদের বিরোধী দল পেয়েছে জাতীয় পার্টি পেয়েছে ১১টি আসন। আওয়ামী লীগের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ পেয়েছে একটি করে আসন। কল্যাণ পার্টি পেয়েছে একটি। এর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছে ৬২টি আসন।
ভোটের পরদিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল জানান, সারা দেশে গড়ে ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ হারে ভোট পড়েছে। আর ভোটের এই হার নিয়ে কেউ যদি চ্যালেঞ্জ করতে চান তাহলে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে টিআইবি বলছে, নির্বাচনে শেষের এক ঘণ্টায় ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ ভোটসহ মোট ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পড়া বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান লিখিত বক্তব্যে বলেন, ক্ষমতা অব্যাহত থাকার কৌশল বাস্তবায়নে একতরফা নির্বাচন সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনের আইনগত বৈধতা নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ হয়তো হবে না, তবে এ সাফল্য রাজনৈতিক শুদ্ধাচার, গণতান্ত্রিক ও নৈতিকতার মানদণ্ডে চিরকাল প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে অবাধ, অংশগ্রহণমূলক, নিরপেক্ষ ও সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিতের যে পূর্বশর্ত থাকে, তা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিপালিত হয়নি।
নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দলের বিপরীতমুখী ও অনড় অবস্থানের কারণে অংশগ্রহণমূলক ও অবাধ নির্বাচন হয়নি বলে টিআইবি মনে করছে ৷ সংস্থাটির মতে, বিপরীতমুখী ও অনড় অবস্থানকেন্দ্রিক ‘এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের লড়াইয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জিম্মি দশা প্রকটতর হয়েছে।
টিআইবি আরও বলেছে, নির্বাচন কমিশন একতরফা নির্বাচনের ‘এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের অন্যতম অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসন অনুরূপভাবে একই ‘এজেন্ডা’র সহায়ক ভূমিকায় ব্যবহৃত হয়েছে।
টিআইবি মনে করছে, সরকারের টানা চতুর্থ মেয়াদের সম্ভাব্য সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে যতটুকু আগ্রহ থাকবে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হবে শুদ্ধাচার ও নৈতিকতার মানদণ্ডে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন এবং তার প্রভাব। দেশের গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনী ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমাগত গভীরতর হবে।
অনুষ্ঠানে টিআইবির প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন গবেষণা দলের সদস্য মাহফুজুল হক, নেওয়াজুল মওলা ও সাজেদুল ইসলাম। টিআইবির উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের ও পরিচালক (গবেষণা) মোহাম্মদ বদিউজ্জামান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

Please Share This Post in Your Social Media

এবারের নির্বাচনী কৌশল ও অভিনবত্ব আন্তর্জাতিক টেস্ট কেস: টিআইবি

প্রকাশ : ১০:০৪:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৪

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘একপক্ষীয় ও পাতানো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ’ হয়েছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সংস্থাটি বলেছে, এবারের নির্বাচন অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। এ নির্বাচন দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।
বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ট্র্যাকিং’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। এতে নির্বাচন নিয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
টিআইবির মতে, এ নির্বাচনের ফলে গণতান্ত্রিক অবনমনের অভিজ্ঞতা এবং নির্বাচনী কৌশল ও অভিনবত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে বিবেচিত হবে।
নির্বাচনের আগে ও পরে ৫০ টি আসনের প্রার্থী ও নির্বাচনি পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে গবেষণাপত্র প্রকাশ করে টিআইবি। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রচারের জন্য প্রার্থীর নির্ধারিত ব্যয়সীমা ২৫ লাখ টাকা হলেও গড়ে একেক জন প্রার্থী প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ করেছেন। পাশাপাশি এই নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গন এবং শাসনব্যবস্থার ওপর ক্ষমতাসীনদলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
টিআইবির পক্ষ থেকে বলা হয়, ভোট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক দেখাতে নিজ দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়া হলেও বেশির ভাগ আসনে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিলো না ২৪১টি আসনের ভোট।
গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। এই ভোটে দলটি সংসদে ২২৩টি আসন পেয়েছে। আগের সংসদের বিরোধী দল পেয়েছে জাতীয় পার্টি পেয়েছে ১১টি আসন। আওয়ামী লীগের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ পেয়েছে একটি করে আসন। কল্যাণ পার্টি পেয়েছে একটি। এর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছে ৬২টি আসন।
ভোটের পরদিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল জানান, সারা দেশে গড়ে ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ হারে ভোট পড়েছে। আর ভোটের এই হার নিয়ে কেউ যদি চ্যালেঞ্জ করতে চান তাহলে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে টিআইবি বলছে, নির্বাচনে শেষের এক ঘণ্টায় ১৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ ভোটসহ মোট ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পড়া বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান লিখিত বক্তব্যে বলেন, ক্ষমতা অব্যাহত থাকার কৌশল বাস্তবায়নে একতরফা নির্বাচন সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনের আইনগত বৈধতা নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ হয়তো হবে না, তবে এ সাফল্য রাজনৈতিক শুদ্ধাচার, গণতান্ত্রিক ও নৈতিকতার মানদণ্ডে চিরকাল প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে অবাধ, অংশগ্রহণমূলক, নিরপেক্ষ ও সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিতের যে পূর্বশর্ত থাকে, তা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিপালিত হয়নি।
নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দলের বিপরীতমুখী ও অনড় অবস্থানের কারণে অংশগ্রহণমূলক ও অবাধ নির্বাচন হয়নি বলে টিআইবি মনে করছে ৷ সংস্থাটির মতে, বিপরীতমুখী ও অনড় অবস্থানকেন্দ্রিক ‘এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের লড়াইয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জিম্মি দশা প্রকটতর হয়েছে।
টিআইবি আরও বলেছে, নির্বাচন কমিশন একতরফা নির্বাচনের ‘এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের অন্যতম অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসন অনুরূপভাবে একই ‘এজেন্ডা’র সহায়ক ভূমিকায় ব্যবহৃত হয়েছে।
টিআইবি মনে করছে, সরকারের টানা চতুর্থ মেয়াদের সম্ভাব্য সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে যতটুকু আগ্রহ থাকবে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হবে শুদ্ধাচার ও নৈতিকতার মানদণ্ডে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন এবং তার প্রভাব। দেশের গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনী ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমাগত গভীরতর হবে।
অনুষ্ঠানে টিআইবির প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন গবেষণা দলের সদস্য মাহফুজুল হক, নেওয়াজুল মওলা ও সাজেদুল ইসলাম। টিআইবির উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের ও পরিচালক (গবেষণা) মোহাম্মদ বদিউজ্জামান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।