ফিল্টার আছে, পানি নেই: টুঙ্গিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সুপেয় পানির সংকট
- প্রকাশ : ০২:০১:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
- / 7
এইচ,এম আওলাদ জেলা প্রতিনিধি- গোপালগঞ্জ।
************************
লবণাক্ত পানি পান করতে না পেরে বাড়ি থেকে বোতল নিয়ে আসে শিশুরা, বছরের পর বছর অচল ফিল্টার—কর্তৃপক্ষের নীরবতা,সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সুপেয় পানির নিশ্চয়তা দিতে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পানি পরিশোধন (ওয়াটার ফিল্টার) ব্যবস্থা স্থাপন করা হলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় তা অচল হয়ে পড়ে আছে।ফলে সরকারের উদ্যোগ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন নিরাপদপানির অভাবে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ২০ নম্বর গিমাডাঙ্গা মুন্সিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তারই একটি উদাহরণ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারিভাবে ফিল্টার স্থাপন করা হলেও সেটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অবহিত করা হলেও এখন পর্যন্ত তা মেরামত কিংবা সচল করার কোনো কার্যকরউদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিসের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় বর্তমানে ৭৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তবে এসব বিদ্যালয়ের সবগুলোতে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন অভিভাবক ও স্থানীয়রা। বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে নিজস্ব পানির উৎস থাকলেও সরকারি পাইপলাইনের (সাপ্লাই) সংযোগ নেই। ফলে বিদ্যালয়টি স্থানীয় উৎসের লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভরশীল।
পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী সেই পানি পান করতে পারে না। ফলে প্রতিদিন বাড়ি থেকে পানিভর্তি বোতল নিয়ে বিদ্যালয়ে আসতে বাধ্য হয় শিক্ষার্থীরা। অনেক সময় বোতলের পানি শেষ হয়ে গেলে তারা দীর্ঘ সময় তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ক্লাস করে। গরমের দিনে এ সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। কয়েকজন অভিভাবক জানান, শিশুদের প্রতিদিন পানি বহন করে পাঠানো অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি ঝামেলা। অনেক শিক্ষার্থী পানি আনতে ভুলে গেলে পুরো দিন নিরাপদ পানি ছাড়াই থাকতে হয়।
সরকারের অর্থ ব্যয়ে স্থাপিত পানি পরিশোধন যন্ত্রটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল থাকলেও সেটি মেরামতের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। বিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, একাধিকবার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ফিল্টারটি সচল করা হয়নি। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন সরকার যখন শিক্ষার্থীদের জন্ নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করেছে,তখন সেটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার।
টুঙ্গিপাড়া উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী উপজেলায় বর্তমানে ৭৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি বিদ্যালয়ের ফিল্টার যদি দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকতে পারে, তাহলে উপজেলার অন্য বিদ্যালয়গুলোর নিরাপদ পানির ব্যবস্থাও কি এইরূপ। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পানির বিষয়টি বিবেচনায়নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে সরকারি সাপ্লাই পানির সংযোগ দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
তিনি বলেন,সরকারি সাপ্লাই পানির সংযোগ পেলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পানির সুযোগ পাবে এবং বর্তমান সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি না পেলে শিশুদের পানিশূন্যতা, কিডনির সমস্যা, উচ্চমাত্রার লবণ গ্রহণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ বিভিন্ন রোগের আশঙ্কা বাড়তে পারে বিদ্যালয় পর্যায়ে নিরাপদ পানির অভাব শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শিক্ষার পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্থানীয়দের ভাষ্য, নিরাপদ পানির সংকট শুধু একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়;এটি শিশুদের মৌলিক অধিকার ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়। তাই বিষয়টি অবহেলার সুযোগ নেই।
সরকারি অর্থে স্থাপিত ফিল্টার দীর্ঘদিন অচল থাকার ঘটনায় শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। উপজেলার অন্যান্য বিদ্যালয়ের ফিল্টারগুলোর অবস্থাও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় কি না, তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু এই বিদ্যালয় নয়, টুঙ্গিপাড়ার সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিরাপদ পানির বাস্তব চিত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অচল ফিল্টারগুলো দ্রুত সংস্কার এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে সরকারি সাপ্লাই পানির সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য,নিরাপদ পরিবেশ ও স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করতে ২০ নম্বর গিমাডাঙ্গা মুন্সিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েজরুরি ভিত্তিতে অচল পানি পরিশোধন যন্ত্র মেরামত, সরকারি সাপ্লাই পানির সংযোগ প্রদান অথবা বিকল্প নিরাপদ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকরা।তাদের মতে,শিশুদের জন্য নিরাপদ পানির বিষয়টি কোনো বিলাসিতা নয়;এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তাই আর দেরি নয়, প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ।




















