গ্যাস সংকটে পোশাক কারখানায় ধস, উৎপাদন কমেছে ৬০%।
- প্রকাশ : ১০:২০:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
- / 21
আখতারুজ্জামান সোহাগ, গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি :
তীব্র গ্যাস সংকটে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে নেমে এসেছে বড় ধরনের স্থবিরতা। ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং কারখানাগুলো।
পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় শিল্পকারখানার বয়লার স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। ফলে ডাইং ও ফিনিশিংয়ে তৈরি পোশাকের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়ের কাজ আটকে যাচ্ছে। কারখানাগুলোতে জমছে সেমি-ফিনিশড কাপড়। ধীর হয়ে পড়ছে পুরো উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ডাইং ও ফিনিশিংয়ের মতো শিল্পে স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রায় ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে অনেক শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআইয়ে। কোথাও কোথাও চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল বন্ধে সংকট তীব্র
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BGMEA) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ২ দশমিক ৬৫ থেকে ২ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় এ সরবরাহ কম।
গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জে পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। সেখানে এক হাজারের বেশি রপ্তানিমুখী কারখানা গ্যাস সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বেশ কিছু ডাইং ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
ডিজেল-এলপিজিতে বাড়ছে খরচ
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় কিছু কারখানা ডিজেল জেনারেটর, এলপিজি ও সিএনজি ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
তবে উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য দেশ থেকে অর্ডার নিতে পারেন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা।
বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তান। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো পণ্য সরবরাহে বাংলাদেশ ব্যর্থ হলে এসব দেশ নতুন অর্ডার পাওয়ার সুযোগ নিতে পারে।
নজরে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। হ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স, ওয়ালমার্ট, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, নাইকি, লেভিস, পিভিএইচ, গ্যাপ ও টার্গেটের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে শুধু কম দাম নয়, সময়মতো পণ্য সরবরাহ, জ্বালানি নিরাপত্তা, উৎপাদন সক্ষমতা ও কমপ্লায়েন্সও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি কমেছে ২ শতাংশ
গ্যাস সংকটের মধ্যেই চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি কিছুটা কমেছে। এ মাসে বাংলাদেশ প্রায় ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম।
BGMEA সভাপতি মাহমুদ হাসান খান অবশ্য এ নিয়ে এখনই উদ্বিগ্ন না হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, গত বছরের জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানিতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। সেই উচ্চ ভিত্তির কারণে এবারের সামান্য পতনকে বড় সংকেত হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।
তবে তিনি স্বীকার করেন, বছরজুড়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। এর অন্যতম কারণ জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন বাস্তব চ্যালেঞ্জ।
শিপমেন্টে ১–২ সপ্তাহ ছাড় চায় BGMEA
গ্যাস সংকটের প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সংগঠন ‘বায়ার্স ফোরাম বাংলাদেশ’-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছে BGMEA।
গ্যাস সংকটে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনা করে এক থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত শিপমেন্ট বিলম্ব মেনে নেওয়ার জন্য ক্রেতাদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি।
BGMEA জানিয়েছে, মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালের মেরামতকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মেরামত শেষ হলে শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ ৮ আগস্ট থেকে উন্নতি শুরু করতে পারে এবং ১৪ আগস্টের মধ্যে প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংকট সাময়িক, সমাধান দীর্ঘমেয়াদি
শিল্প মালিকরা বলছেন, এলএনজি টার্মিনাল মেরামত হলে বর্তমান সংকট কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু বারবার জ্বালানি সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।
তারা নতুন ভাসমান ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, গ্যাস সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো এবং শিল্পাঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই গ্যাস সংকট শুধু কারখানার উৎপাদনকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, এটি দেশের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানের জন্যও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় দাবি।




















