কৃষকের সার যাচ্ছে অন্য জেলায়, বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ; প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
- প্রকাশ : ০২:১২:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 2

আক্কাস আলী খান , রাজবাড়ী প্রতিনিধি
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সার বিতরণ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার জেলার বাইরে বিক্রি, সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি দাম আদায় এবং চাহিদা অনুযায়ী খুচরা বিক্রেতাদের সার না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ডিলারদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের একটি অংশের অনিয়মের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের দুর্বল নজরদারির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে বিপাকে পড়ছেন কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষক ও খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, গোয়ালন্দের উপজেলা পর্যায়ে বিসিআইসি ও বিএডিসির পাঁচ ডিলারের মধ্যে কয়েকজন চাহিদা অনুযায়ী খুচরা বিক্রেতাদের সার সরবরাহ করেন না। কখনো ‘সার নেই’ বলে জানানো হয়, আবার কখনো বাড়তি টাকা ছাড়া সার দেওয়া হয় না। অভিযোগ রয়েছে, একই সময়ে জেলার বাইরে অপেক্ষাকৃত বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে।
কৃষকদের ভাষ্য, সরকারি দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারদরের বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও ৫০ কেজির এক বস্তা সারের জন্য ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। বিশেষ করে এমওপি সার নিয়ে বেশি ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন কৃষকরা।
সম্প্রতি মেসার্স মন্ডল ট্রেডার্স থেকে ফরিদপুর সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুর এলাকার কোব্বাত নামের এক খুচরা বিক্রেতার কাছে সার বিক্রির অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় কৃষকরা সার বহনকারী চালান আটকে দেন। পরে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি উপজেলা কৃষি অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবহিত করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই দেলোয়ার নামে এক ব্যক্তি সেখানে গিয়ে সার নিয়ে চলে যান। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পুরো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে বলেও দাবি করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
এ বিষয়ে পরে মন্ডল ট্রেডার্সকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, অভিযোগের ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্য থাকার পরও শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকবে কি না।
গত ১৮ আগস্ট অবৈধভাবে সার পাচারের সময় এক ডিলারকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এর আগেও সার পাচারের অভিযোগে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।
এ ছাড়া কয়েক দিন আগে মুন্সি বাজার এলাকায় অবৈধভাবে বিক্রির সময় সার জব্দ করা হয়। পরে ওই সার উপজেলা পর্যায়ে নেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরবর্তীতে সেই সার মন্ডল ট্রেডার্সের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
মন্ডল ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে এর আগে স্থানীয় কৃষকরা মানববন্ধনও করেছিলেন। অভিযোগের পর প্রায় দুই মাস ওই প্রতিষ্ঠানের সার বিতরণ বন্ধ ছিল বলে স্থানীয়রা জানান। এরপর আবারও প্রতিষ্ঠানটিকে সার দেওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
শুধু উপজেলা পর্যায়ের ডিলার নয়, ইউনিয়ন পর্যায়ের ডিলারদের বিরুদ্ধেও জেলার বাইরে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। উজানচর ইউনিয়নের ডিলার নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফরিদপুরের ঈশান গোপালপুর এলাকায় সার বিক্রির অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কৃষক।
তবে নজরুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘কৃষকরা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছেন। আমি তাদের কাছে কীটনাশক বিক্রি করলেও সার বিক্রি করি না।’
ছোট ভাকলা ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা সপ্তবর্ণা ট্রেডার্সের বিরুদ্ধেও বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে সাহা ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন খুচরা সার বিক্রেতা বলেন, ‘বস্তাপ্রতি বাড়তি টাকা না দিলে অনেক সময় ডিলাররা সার দিতে চান না। আবার সার নেই বলে জানিয়ে অন্য জায়গায় বিক্রি করে দেওয়া হয়।’
তাদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৫০ টাকা দামের এমওপি সারের বস্তায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। ফলে বাড়তি দামের চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে কৃষকের ওপর।
কৃষকদের অভিযোগ, জেলা ও উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির নিয়মিত সভায় সারের সংকট নেই বলে জানানো হলেও মাঠের চিত্র ভিন্ন। প্রয়োজনের সময় ডিলারের দোকানে গিয়ে অনেক কৃষক সার পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে তাদের বেশি দামে খোলা বাজার থেকে সার কিনতে হচ্ছে।
কৃষকদের প্রশ্ন, সরকারি হিসাব অনুযায়ী যদি পর্যাপ্ত সার সরবরাহ থাকে, তাহলে বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে কেন? কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার যদি অন্য জেলায় চলে যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের নজরদারি কোথায়?
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মের সঙ্গে কারা জড়িত তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিলারদের গুদাম, মজুত রেজিস্টার, বিক্রয় রসিদ, পরিবহন চালান ও প্রকৃত কৃষকের কাছে বিক্রির তথ্য নিয়মিত যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।
গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি অফিসার বলেন, ‘সার ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মন্ডল ট্রেডার্সকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।’
তবে কৃষকদের দাবি, শুধু মনিটরিংয়ের ঘোষণা নয়, সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এতে আমন মৌসুমে কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি সার বিতরণ ব্যবস্থার প্রতি আস্থাও ফিরবে বলে মনে করছেন তারা।



















