১২:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২৪

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের অসঙ্গতিপূর্ণ বিবৃতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক,
  • প্রকাশ : ০৫:১৪:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৪
  • / 109

সাত জানুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে এবং জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্রমাগত চাপে ফেলে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই তাদের নির্বাচন পরবর্তী কূটকৌশল চালনা শুরু করে দিয়েছে। যা দৃশ্যমান হয়েছে ৮ জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নানা অসঙ্গতিপূর্ণ একটি বিবৃতির মাধ্যমে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জনগণের মতামতকে কখনোই গুরুত্ব দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। বিবৃতিতে বাংলাদেশের জনআকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন দেয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে নিজেদের প্রাধান্য ধরে রাখার একটি কৌশল মাত্র।

•    মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণ এবং গণতন্ত্র, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য তাদের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে।
•    তাহলে ৭ জানুয়ারি নির্বাচনে, দেশের মোট ভোটারের ৪২ শতাংশ ভোটারের মত প্রকাশের রায়কে উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে মন্তব্য করে? তাদের কাছে কি এই ৪২ শতাংশ মানুষের মতামতের কোনো গুরুত্ব নেই?  যুক্তরাষ্ট্র যদি দেশের জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সত্যিকার অর্থেই সমর্থন করতো তাহলে এই ৪২ ভাগ ভোটারের ভোট প্রয়োগের মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এ ধরনের বিবৃতি দিতো না।
•    ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে এদেশের ৭ কোটি মুক্তিকামী জনগণ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। সে সময় এই ৭ কোটি মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সমর্থন দিয়েছিল। তাই ঐতিহাসিকভাবেও যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এদেশের মানুষের মতামতকে সমর্থন করেনি।

নাশকতাকারী ও তাদের হুকুমদাতা রাজনৈতিক বিরোধী সদস্যদের গ্রেপ্তারে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের উদ্বেগ প্রকাশ পরোক্ষভাবে সন্ত্রাসবাদকে প্ররোচনা দিচ্ছে।

•    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাজার হাজার রাজনৈতিক বিরোধী সদস্যদের গ্রেপ্তার দ্বারা উদ্বিগ্ন রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
•    যেসকল বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তারা যে নাশকতার দায়ে অভিযুক্ত সেটিও নিশ্চয় অবগত আছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট। ২৮ অক্টোবর থেকে হরতাল অবরোধের নামে সারা দেশে যানবাহন পুড়িয়েছে, মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে, সরকারি স্থাপনায় আক্রমণ করেছে যারা, সেসকল নাশকতাকারী এবং তাদের হুকুমদাতাদের আইনের আওতায় আনাটাই কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চোখে অপরাধ?
•    পাশাপাশি কারা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গত ২৬/১০/২৩ তারিখ থেকে ৫/১/২৪ তারিখ পর্যন্ত ১০ হাজার ৯৯৭ জন আসামি জামিনে মুক্ত হয়েছে, যে তথ্যটি সুকৌশলে এড়িয়ে গেছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
•    তারপরেও সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণসাপেক্ষে নাশকতার দায়ে গ্রেপ্তারকৃত বিরোধী দলের সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের জন্য মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের উদ্বিগ্নতা এটিই প্রমাণ করে যে, পরোক্ষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদকেই প্ররোচনা দিচ্ছে ।

নির্বাচনের দিন অনিয়মের রিপোর্ট নিয়ে মনগড়া বার্তা দিয়ে পুরো নির্বাচনব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট।

•    বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সকল জাতীয় নির্বাচনেই কম বেশী অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। শুধু বাংলদেশই নয়, বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই এটি লক্ষ্য করা যায়।
•    এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসকল অনিয়ম হয়েছে তা অন্য সকল নির্বাচনের তুলনায় নগণ্য। এমনকি এবারের নির্বাচন কমিশনও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে বদ্ধপরিকর ছিল যা তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। যেখানেই অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে নির্বাচন কমিশন সেখানে ভোটগ্রহণ বন্ধ রেখেছে,এমনকি ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রার্থীকে ( চট্টগ্রাম ১৬-মুস্তাফিজুর রহমান) অনিয়মে জড়িত থাকায় নির্বাচন চলাকালীন সময়ে তার প্রার্থীতা বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।
•    নির্বাচনে অনিয়মের পার্সেন্টেজ যখন নগণ্য থাকে তখন এই নগণ্য অনিয়মের ঘটনার জন্য পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কখনোই বাতিল ঘোষণা করা হয় না।
•    সেক্ষেত্রে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়মের ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বিবৃতিতে উল্লেখ করে পুরো নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে তারা অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের সাথে এই মতামত শেয়ার করে যে এই নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু ছিল না। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের মন্তব্য টেনে আনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

•    মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের সাথে তারা এই মতামত শেয়ার করে যে এই নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু ছিল না।
•    আমরা যদি ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের দিনটি লক্ষ্য করি, তাহলে দেখা যাবে যে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থাসহ (ওআইসি) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বেশ কয়েকটি দেশের পর্যবেক্ষকেরা। আমন্ত্রিত এসব বিদেশি পর্যবেক্ষক বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের পরিবেশের প্রশংসা করেছেন।
•    ৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে জাতীয় নির্বাচনের ভোট পর্যবেক্ষণ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাঁরা এ মন্তব্য করেন। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণে এ সংবাদ সম্মেলন হয়।
•    বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখার কথা জানিয়ে ফিলিস্তিনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হাশিম কুহাইল বলেন, ভোট শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া ভোটের পরিবেশও খুব ভালো ছিল। নাগরিকদের ভোটদান প্রক্রিয়াও খুব সহজ ছিল।
•    কানাডার পার্লামেন্ট সদস্য চন্দ্রকান্ত আর্য বলেন, ভোট সুষ্ঠুভাবে শেষ হয়েছে। ভোটে রেকর্ডসংখ্যক নারী ভোটার উপস্থিত ছিলেন। আমরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ভোটকেন্দ্রে গিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। সুষ্ঠু ভোট প্রক্রিয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অভিনন্দন জানাই।
•    এক প্রশ্নের জবাবে চন্দ্রকান্ত আর্য বলেন, যারা ভোট বর্জন করেছে, সেটা তাদের বিষয়, এটা আমাদের বিষয় না। কানাডায়ও ভোট ৪৩ শতাংশ পড়েছিল, সেটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। জনগণ ভোট দিতে পারছে কি না, এটাই দেখার বিষয়। ভোটার কত শতাংশ এল তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যারা এসেছে, তারা ঠিকমতো ভোট দিয়েছে নির্বিঘ্নে। তাই এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণ নেই।
•    নাইজেরিয়ার সিনেটর প্যাট্রিক সি বলেন, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। স্থানীয় লোকজনকে উৎসাহের সঙ্গে ভোট দিতে দেখেছেন। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
•    সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক পাওলো কাসাকা বলেন, নির্বাচন অবাধও সুষ্ঠু হয়েছে। তবে প্রধান বিরোধী দল এলে নির্বাচন আরও অংশগ্রহণমূলক হতো। স্বচ্ছ তালিকা ও ভোট পদ্ধতির প্রশংসা করেন তিনি।
•    ১০ কেন্দ্রে গিয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরে আমেরিকান গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলেক্সান্ডার বি গ্রে বলেন, “আমার চোখে আমি যেটা দেখেছি, সেটা হচ্ছে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। এমন নির্বাচন যেটা পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালনা করা হয়েছে, ভোটারদের মধ্যে অনেক উৎসাহের নির্বাচন।
•    যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কংগ্রেস সদস্য জিম বেইটস বলেন, বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে কম সময়ের ভোট হয়। এ কারণে যখন আমি শুনি, ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার কথা, তখন আমার কেবল ৮টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ভোট হওয়ার কথা মাথায় আসে।” তিনি বলেন, “আমি যেটা পেয়েছি, খুব শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। যখন আমি দেখি, বিরোধী দল প্রত্যাহার করে নেয়, এই দল একবার ওইদল আরেকবার, দেশকে ভালোর জন্য এক হয়ে আসতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি দেখে আমি অভিভূত।
•    দ্বাদশ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে আসা রাশিয়ার ৩ পর্যবেক্ষক দলের দলনেতা আন্দ্রে সুটভ বলেন, আমরা বিভিন্ন স্থানের ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছি। সকল স্থানেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চোখে পড়েছে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো ছিল।
•    স্কটিশ পার্লামেন্টের সদস্য মার্টিন ডে বলেন, এই প্রথম আমি বাংলাদেশে এসেছি। ভোটের প্রক্রিয়া দেখেছি। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ভোট হয়েছে কিন্তু ভোটার উপস্থিতি কম ছিল।

প্রথম দিনেই ১১টি দেশ নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগকে অভিনন্দন জানিয়েছে, তারপরও মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এ ধরনের বিবৃতি দুঃখজনক।

•    দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়লাভের পর গত ৮ জানুয়ারি শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে -ভারত, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, নেপাল, ব্রাজিল, মরক্কো, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, ভুটান এবং ফিলিপিন্স।
•    ধীরে ধীরে অন্যান্য দেশও অভিনন্দন জানাবে বলে জানা যায়। সংবিধানকে প্রাধান্য দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেয়া আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
•    সকল দেশী ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে যখন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিল আওয়ামী লীগ সরকার তখন আওয়ামী লীগ সরকারকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র গুটি কয়েক দেশ পরে আছে কীভাবে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়, যা সত্যিই দুঃখজনক।

Please Share This Post in Your Social Media

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২৪

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের অসঙ্গতিপূর্ণ বিবৃতি

প্রকাশ : ০৫:১৪:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৪

সাত জানুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে এবং জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্রমাগত চাপে ফেলে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই তাদের নির্বাচন পরবর্তী কূটকৌশল চালনা শুরু করে দিয়েছে। যা দৃশ্যমান হয়েছে ৮ জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নানা অসঙ্গতিপূর্ণ একটি বিবৃতির মাধ্যমে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জনগণের মতামতকে কখনোই গুরুত্ব দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। বিবৃতিতে বাংলাদেশের জনআকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন দেয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে নিজেদের প্রাধান্য ধরে রাখার একটি কৌশল মাত্র।

•    মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণ এবং গণতন্ত্র, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য তাদের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে।
•    তাহলে ৭ জানুয়ারি নির্বাচনে, দেশের মোট ভোটারের ৪২ শতাংশ ভোটারের মত প্রকাশের রায়কে উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে মন্তব্য করে? তাদের কাছে কি এই ৪২ শতাংশ মানুষের মতামতের কোনো গুরুত্ব নেই?  যুক্তরাষ্ট্র যদি দেশের জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সত্যিকার অর্থেই সমর্থন করতো তাহলে এই ৪২ ভাগ ভোটারের ভোট প্রয়োগের মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এ ধরনের বিবৃতি দিতো না।
•    ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে এদেশের ৭ কোটি মুক্তিকামী জনগণ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল। সে সময় এই ৭ কোটি মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সমর্থন দিয়েছিল। তাই ঐতিহাসিকভাবেও যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এদেশের মানুষের মতামতকে সমর্থন করেনি।

নাশকতাকারী ও তাদের হুকুমদাতা রাজনৈতিক বিরোধী সদস্যদের গ্রেপ্তারে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের উদ্বেগ প্রকাশ পরোক্ষভাবে সন্ত্রাসবাদকে প্ররোচনা দিচ্ছে।

•    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাজার হাজার রাজনৈতিক বিরোধী সদস্যদের গ্রেপ্তার দ্বারা উদ্বিগ্ন রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
•    যেসকল বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তারা যে নাশকতার দায়ে অভিযুক্ত সেটিও নিশ্চয় অবগত আছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট। ২৮ অক্টোবর থেকে হরতাল অবরোধের নামে সারা দেশে যানবাহন পুড়িয়েছে, মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে, সরকারি স্থাপনায় আক্রমণ করেছে যারা, সেসকল নাশকতাকারী এবং তাদের হুকুমদাতাদের আইনের আওতায় আনাটাই কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চোখে অপরাধ?
•    পাশাপাশি কারা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গত ২৬/১০/২৩ তারিখ থেকে ৫/১/২৪ তারিখ পর্যন্ত ১০ হাজার ৯৯৭ জন আসামি জামিনে মুক্ত হয়েছে, যে তথ্যটি সুকৌশলে এড়িয়ে গেছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
•    তারপরেও সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণসাপেক্ষে নাশকতার দায়ে গ্রেপ্তারকৃত বিরোধী দলের সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের জন্য মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের উদ্বিগ্নতা এটিই প্রমাণ করে যে, পরোক্ষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদকেই প্ররোচনা দিচ্ছে ।

নির্বাচনের দিন অনিয়মের রিপোর্ট নিয়ে মনগড়া বার্তা দিয়ে পুরো নির্বাচনব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট।

•    বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সকল জাতীয় নির্বাচনেই কম বেশী অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। শুধু বাংলদেশই নয়, বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই এটি লক্ষ্য করা যায়।
•    এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসকল অনিয়ম হয়েছে তা অন্য সকল নির্বাচনের তুলনায় নগণ্য। এমনকি এবারের নির্বাচন কমিশনও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে বদ্ধপরিকর ছিল যা তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। যেখানেই অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে নির্বাচন কমিশন সেখানে ভোটগ্রহণ বন্ধ রেখেছে,এমনকি ক্ষমতাসীন দলের একজন প্রার্থীকে ( চট্টগ্রাম ১৬-মুস্তাফিজুর রহমান) অনিয়মে জড়িত থাকায় নির্বাচন চলাকালীন সময়ে তার প্রার্থীতা বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।
•    নির্বাচনে অনিয়মের পার্সেন্টেজ যখন নগণ্য থাকে তখন এই নগণ্য অনিয়মের ঘটনার জন্য পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কখনোই বাতিল ঘোষণা করা হয় না।
•    সেক্ষেত্রে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়মের ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বিবৃতিতে উল্লেখ করে পুরো নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে তারা অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের সাথে এই মতামত শেয়ার করে যে এই নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু ছিল না। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের মন্তব্য টেনে আনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

•    মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের সাথে তারা এই মতামত শেয়ার করে যে এই নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু ছিল না।
•    আমরা যদি ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের দিনটি লক্ষ্য করি, তাহলে দেখা যাবে যে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থাসহ (ওআইসি) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বেশ কয়েকটি দেশের পর্যবেক্ষকেরা। আমন্ত্রিত এসব বিদেশি পর্যবেক্ষক বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের পরিবেশের প্রশংসা করেছেন।
•    ৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে জাতীয় নির্বাচনের ভোট পর্যবেক্ষণ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাঁরা এ মন্তব্য করেন। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণে এ সংবাদ সম্মেলন হয়।
•    বেশ কয়েকটি ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখার কথা জানিয়ে ফিলিস্তিনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হাশিম কুহাইল বলেন, ভোট শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া ভোটের পরিবেশও খুব ভালো ছিল। নাগরিকদের ভোটদান প্রক্রিয়াও খুব সহজ ছিল।
•    কানাডার পার্লামেন্ট সদস্য চন্দ্রকান্ত আর্য বলেন, ভোট সুষ্ঠুভাবে শেষ হয়েছে। ভোটে রেকর্ডসংখ্যক নারী ভোটার উপস্থিত ছিলেন। আমরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ভোটকেন্দ্রে গিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। সুষ্ঠু ভোট প্রক্রিয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অভিনন্দন জানাই।
•    এক প্রশ্নের জবাবে চন্দ্রকান্ত আর্য বলেন, যারা ভোট বর্জন করেছে, সেটা তাদের বিষয়, এটা আমাদের বিষয় না। কানাডায়ও ভোট ৪৩ শতাংশ পড়েছিল, সেটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। জনগণ ভোট দিতে পারছে কি না, এটাই দেখার বিষয়। ভোটার কত শতাংশ এল তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যারা এসেছে, তারা ঠিকমতো ভোট দিয়েছে নির্বিঘ্নে। তাই এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণ নেই।
•    নাইজেরিয়ার সিনেটর প্যাট্রিক সি বলেন, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। স্থানীয় লোকজনকে উৎসাহের সঙ্গে ভোট দিতে দেখেছেন। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
•    সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক পাওলো কাসাকা বলেন, নির্বাচন অবাধও সুষ্ঠু হয়েছে। তবে প্রধান বিরোধী দল এলে নির্বাচন আরও অংশগ্রহণমূলক হতো। স্বচ্ছ তালিকা ও ভোট পদ্ধতির প্রশংসা করেন তিনি।
•    ১০ কেন্দ্রে গিয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরে আমেরিকান গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলেক্সান্ডার বি গ্রে বলেন, “আমার চোখে আমি যেটা দেখেছি, সেটা হচ্ছে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। এমন নির্বাচন যেটা পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালনা করা হয়েছে, ভোটারদের মধ্যে অনেক উৎসাহের নির্বাচন।
•    যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কংগ্রেস সদস্য জিম বেইটস বলেন, বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে কম সময়ের ভোট হয়। এ কারণে যখন আমি শুনি, ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার কথা, তখন আমার কেবল ৮টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ভোট হওয়ার কথা মাথায় আসে।” তিনি বলেন, “আমি যেটা পেয়েছি, খুব শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। যখন আমি দেখি, বিরোধী দল প্রত্যাহার করে নেয়, এই দল একবার ওইদল আরেকবার, দেশকে ভালোর জন্য এক হয়ে আসতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি দেখে আমি অভিভূত।
•    দ্বাদশ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে আসা রাশিয়ার ৩ পর্যবেক্ষক দলের দলনেতা আন্দ্রে সুটভ বলেন, আমরা বিভিন্ন স্থানের ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছি। সকল স্থানেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চোখে পড়েছে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো ছিল।
•    স্কটিশ পার্লামেন্টের সদস্য মার্টিন ডে বলেন, এই প্রথম আমি বাংলাদেশে এসেছি। ভোটের প্রক্রিয়া দেখেছি। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ভোট হয়েছে কিন্তু ভোটার উপস্থিতি কম ছিল।

প্রথম দিনেই ১১টি দেশ নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগকে অভিনন্দন জানিয়েছে, তারপরও মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এ ধরনের বিবৃতি দুঃখজনক।

•    দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়লাভের পর গত ৮ জানুয়ারি শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে -ভারত, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, নেপাল, ব্রাজিল, মরক্কো, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, ভুটান এবং ফিলিপিন্স।
•    ধীরে ধীরে অন্যান্য দেশও অভিনন্দন জানাবে বলে জানা যায়। সংবিধানকে প্রাধান্য দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেয়া আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
•    সকল দেশী ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে যখন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিল আওয়ামী লীগ সরকার তখন আওয়ামী লীগ সরকারকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র গুটি কয়েক দেশ পরে আছে কীভাবে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়, যা সত্যিই দুঃখজনক।