০৭:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভিএক্সসি ওয়ার্ল্ডের নামে কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ, সর্বস্ব হারিয়ে পথে বহু পরিবার

আক্কাস আলী খান রাজবাড়ী প্রতিনিধি।
  • প্রকাশ : ০১:৫৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
  • / 3

আক্কাস আলী খান রাজবাড়ী প্রতিনিধি।

রাজবাড়ীতে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি, ইউনিপে টু ইউ ও জেকা বাজারের পর এবার ভিএক্সসি ওয়ার্ল্ড (VXC World) নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, শিক্ষক ও ধর্মীয় পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টাকা ফেরত না পেয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন অনেক বিনিয়োগকারী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজবাড়ীতে ভিএক্সসি ওয়ার্ল্ডের কোনো প্রকাশ্য অফিস না থাকলেও শহরের বারেয়া বিগ বাজার (বর্তমানে আইয়ুব হিলটপ সুপার মার্কেট) ভবনের তৃতীয় তলায় দীর্ঘদিন কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। প্রায় এক বছর আগে ওই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাসে দীর্ঘদিন কেউ মুখ না খুললেও সম্প্রতি একাধিক ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে অভিযোগ আনতে শুরু করেছেন।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের ভান্ডারিয়া গ্রাম থেকেই একজন এজেন্ট প্রায় এক কোটি টাকার বেশি সংগ্রহ করেছেন। তার প্রলোভনে পড়ে গ্রামের বহু পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধারদেনা করে বিনিয়োগের পর ঋণের চাপ ও মানসিক দুশ্চিন্তায় আবু তাহের জামাল নামে এক ইমামের মৃত্যুর ঘটনাও এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ভান্ডারিয়া গ্রামের বাসিন্দা শিমুল শেখ জানান, বসন্তপুর কো-অপারেটিভ হাইস্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক আব্দুল হক তাকে লাভজনক অনলাইন ব্যবসার কথা বলে ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করান। টাকা নেওয়ার পর তিনি ১২ লাখ টাকার একটি চেক দিলেও পরে ব্যাংকে গিয়ে জানতে পারেন সেটি স্ক্যান করা চেক। দীর্ঘদিন টাকা ফেরত না পেয়ে তিনি আদালতে প্রতারণার মামলা দায়ের করেছেন।

একই গ্রামের আব্দুল জব্বার শেখ জানান, একইভাবে তিনি ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। পরে আব্দুল হক তার নামে একটি চেক দিলেও ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সেটি ডিজঅনার হয়। এ ঘটনায় তিনি আদালতে মামলা করেছেন।

আরেক ভুক্তভোগী ইমাম হোসেন বলেন, মসজিদে পরিচয়ের সূত্র ধরে তাকে ‘হালাল ব্যবসা’র কথা বলে মোট ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করানো হয়। পরে তিনি কোনো টাকা ফেরত পাননি। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি সালিশে উপস্থিত হননি।

একই গ্রামের হাসান শেখ জানান, প্রায় দেড় বছর আগে অনলাইন ব্যবসার কথা বলে তার কাছ থেকেও আড়াই লাখ টাকা নেওয়া হয়। এখনও তিনি সেই টাকা ফেরত পাননি।

ভুক্তভোগী আবু তাহের জামালের স্ত্রী রোজিনা বেগম বলেন, তার স্বামীকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংক থেকে তার স্বামীর নামে ৫ লাখ টাকা ঋণ করিয়েও সেই অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। টাকা ফেরত না পাওয়ার দুশ্চিন্তায় তার স্বামী স্ট্রোকে মারা যান বলে দাবি করেন তিনি। বর্তমানে দুই সন্তান নিয়ে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলেও জানান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু ভান্ডারিয়া গ্রাম নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও অসংখ্য মানুষ ভিএক্সসি ওয়ার্ল্ডে বিনিয়োগ করে প্রতারিত হয়েছেন। কোনাইল গ্রামের হাবিবুর রহমানসহ অনেকের কাছ থেকেও লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, এ ঘটনায় শুধু একজন নন, আরও কয়েকজন শিক্ষক, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন পেশার লোক জড়িত থাকতে পারেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় এনে ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফেরত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ভুক্তভোগীরা বলেন, তাদের জীবনের সঞ্চয়, জমি বিক্রির টাকা, বিদেশে লোক পাঠানোর জন্য জমানো অর্থ এবং ব্যাংক ঋণের টাকা পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এখন তারা চরম আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। তাই দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

Please Share This Post in Your Social Media

ভিএক্সসি ওয়ার্ল্ডের নামে কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ, সর্বস্ব হারিয়ে পথে বহু পরিবার

প্রকাশ : ০১:৫৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

আক্কাস আলী খান রাজবাড়ী প্রতিনিধি।

রাজবাড়ীতে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি, ইউনিপে টু ইউ ও জেকা বাজারের পর এবার ভিএক্সসি ওয়ার্ল্ড (VXC World) নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, শিক্ষক ও ধর্মীয় পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টাকা ফেরত না পেয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন অনেক বিনিয়োগকারী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজবাড়ীতে ভিএক্সসি ওয়ার্ল্ডের কোনো প্রকাশ্য অফিস না থাকলেও শহরের বারেয়া বিগ বাজার (বর্তমানে আইয়ুব হিলটপ সুপার মার্কেট) ভবনের তৃতীয় তলায় দীর্ঘদিন কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। প্রায় এক বছর আগে ওই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাসে দীর্ঘদিন কেউ মুখ না খুললেও সম্প্রতি একাধিক ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে অভিযোগ আনতে শুরু করেছেন।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের ভান্ডারিয়া গ্রাম থেকেই একজন এজেন্ট প্রায় এক কোটি টাকার বেশি সংগ্রহ করেছেন। তার প্রলোভনে পড়ে গ্রামের বহু পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধারদেনা করে বিনিয়োগের পর ঋণের চাপ ও মানসিক দুশ্চিন্তায় আবু তাহের জামাল নামে এক ইমামের মৃত্যুর ঘটনাও এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ভান্ডারিয়া গ্রামের বাসিন্দা শিমুল শেখ জানান, বসন্তপুর কো-অপারেটিভ হাইস্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক আব্দুল হক তাকে লাভজনক অনলাইন ব্যবসার কথা বলে ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করান। টাকা নেওয়ার পর তিনি ১২ লাখ টাকার একটি চেক দিলেও পরে ব্যাংকে গিয়ে জানতে পারেন সেটি স্ক্যান করা চেক। দীর্ঘদিন টাকা ফেরত না পেয়ে তিনি আদালতে প্রতারণার মামলা দায়ের করেছেন।

একই গ্রামের আব্দুল জব্বার শেখ জানান, একইভাবে তিনি ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। পরে আব্দুল হক তার নামে একটি চেক দিলেও ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সেটি ডিজঅনার হয়। এ ঘটনায় তিনি আদালতে মামলা করেছেন।

আরেক ভুক্তভোগী ইমাম হোসেন বলেন, মসজিদে পরিচয়ের সূত্র ধরে তাকে ‘হালাল ব্যবসা’র কথা বলে মোট ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করানো হয়। পরে তিনি কোনো টাকা ফেরত পাননি। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি সালিশে উপস্থিত হননি।

একই গ্রামের হাসান শেখ জানান, প্রায় দেড় বছর আগে অনলাইন ব্যবসার কথা বলে তার কাছ থেকেও আড়াই লাখ টাকা নেওয়া হয়। এখনও তিনি সেই টাকা ফেরত পাননি।

ভুক্তভোগী আবু তাহের জামালের স্ত্রী রোজিনা বেগম বলেন, তার স্বামীকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংক থেকে তার স্বামীর নামে ৫ লাখ টাকা ঋণ করিয়েও সেই অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। টাকা ফেরত না পাওয়ার দুশ্চিন্তায় তার স্বামী স্ট্রোকে মারা যান বলে দাবি করেন তিনি। বর্তমানে দুই সন্তান নিয়ে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলেও জানান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু ভান্ডারিয়া গ্রাম নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও অসংখ্য মানুষ ভিএক্সসি ওয়ার্ল্ডে বিনিয়োগ করে প্রতারিত হয়েছেন। কোনাইল গ্রামের হাবিবুর রহমানসহ অনেকের কাছ থেকেও লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, এ ঘটনায় শুধু একজন নন, আরও কয়েকজন শিক্ষক, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন পেশার লোক জড়িত থাকতে পারেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় এনে ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফেরত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ভুক্তভোগীরা বলেন, তাদের জীবনের সঞ্চয়, জমি বিক্রির টাকা, বিদেশে লোক পাঠানোর জন্য জমানো অর্থ এবং ব্যাংক ঋণের টাকা পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এখন তারা চরম আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। তাই দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।