আধুনিকতার চাপে হারাচ্ছে বালিয়াকান্দির মৃৎশিল্প
- প্রকাশ : ০১:২৮:৪১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 3

আক্কাস আলী খান রাজবাড়ী প্রতিনিধি,
একসময় কুমারপাড়ায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল কর্মচাঞ্চল্য। মাটির দলা হাতে নিয়ে কেউ ব্যস্ত থাকতেন হাঁড়ি-পাতিল তৈরিতে, কেউবা চাকা ঘুরিয়ে বানাতেন কলস, মালসা কিংবা মাটির খেলনা। বাড়ির উঠানে সারি সারি করে শুকানো হতো মাটির তৈরি সামগ্রী। হাট-বাজারে এসব পণ্যের ছিল ব্যাপক চাহিদা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। আধুনিক প্রযুক্তির তৈরি অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও প্লাস্টিকের তৈজসপত্রের দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে এখন সেই চিত্রই দেখা যাচ্ছে। উপজেলার কয়েকটি এলাকায় এখনো কিছু পরিবার পূর্বপুরুষের পেশা আঁকড়ে ধরে রেখেছে। তবে চাহিদা কমে যাওয়া, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ ও আধুনিক পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারায় ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে এ শিল্প। একসময়ের ব্যস্ত কুমারপাড়াগুলোতে এখন আর আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য নেই। জীবিকার তাগিদে অনেকেই পেশা বদলে অন্য কাজে চলে গেছেন।
বালিয়াকান্দির জামালপুর ইউনিয়নের বৃ-মাগুড়া গ্রামের পালপাড়া, বহরপুর ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া এবং ইসলামপুর ইউনিয়নের রামরিয়া কুমোরপাড়ায় মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য রয়েছে। এসব এলাকায় এখনো কয়েকটি পরিবার মাটির তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী ও প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। তবে পূর্বের তুলনায় তা অনেকটাই কমে এসেছে।
সরেজমিনে জামালপুর ইউনিয়নের বৃ-মাগুড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রায় ১৫টি পাল পরিবার বসবাস করে। পাড়ার অধিকাংশ মানুষ সনাতন ধর্মাবলম্বী। কয়েকটি পরিবার এখনো মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। কেউ তৈরি করছেন বিভিন্ন ধরনের প্রতিমা, আবার কেউ বানাচ্ছেন হাঁড়ি, পাতিল, মালসা, ফুলের টব, খেলনা ও মাটির ব্যাংক।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় দুই শত বছর ধরে এ পাড়ার মানুষের জীবিকার সঙ্গে মিশে আছে মৃৎশিল্প। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশা একসময় তাদের প্রধান আয়ের উৎস ছিল। বিভিন্ন জেলা থেকে আগাম অর্ডার আসত। ব্যস্ত থাকত পুরো কুমারপাড়া। মাটির তৈরি সামগ্রী নিয়ে হাট-বাজারে বসত বেচাকেনার আসর।
কিন্তু সেই সুদিন এখন অতীত।
মৃৎশিল্পী অনন্ত পাল বলেন, ‘বাবা-দাদার কাছ থেকেই মাটির কাজ শিখেছি। ছোটবেলা থেকেই এ কাজের সঙ্গে জড়িত। একসময় আমাদের তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, কলস ও মালসার ব্যাপক চাহিদা ছিল। বিভিন্ন জায়গা থেকে আগাম অর্ডার আসত। এখন আধুনিক পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এ পেশা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তিনি জানান, একসময় মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলস ও মালসা ছিল মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র। মাটির তৈরি এসব পণ্য স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ায় মানুষের কাছে এর আলাদা কদর ছিল। কিন্তু বর্তমানে অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ও প্লাস্টিকের তৈরি সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় মাটির পণ্যের ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
আগে যেখানে কুমারপাড়ার কারিগররা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ হাঁড়ি, পাতিল, কলস ও মালসা তৈরি করতেন, সেখানে এখন এসব পণ্যের উৎপাদন প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। বর্তমানে তুলনামূলকভাবে কিছু খেলনা, ফুলের টব, মাটির ব্যাংক ও বিভিন্ন শৌখিন সামগ্রী তৈরি হচ্ছে।
মৃৎশিল্পী দীপন পাল বলেন, ‘পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এ পেশায় আসতে চায় না। বর্তমানে অল্প কয়েকজন এই কাজ করছেন। এভাবে চলতে থাকলে একসময় হয়তো মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোও আর থাকবে না।’
সুনীল পাল বলেন, ‘মাটির কাজ আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। কয়েক পুরুষ ধরে আমাদের পরিবার এ কাজ করে আসছে। আমরাও করছি। তবে আগের মতো আয় নেই। তারপরও পূর্বপুরুষের পেশা বলে এখনো ধরে রেখেছি।’
তিনি জানান, কাজের গতি বাড়াতে আগে হাতে ঘোরানো চাক ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে অনেক কারিগর ইলেকট্রিক চাক ব্যবহার করছেন। এতে সময় ও শ্রম কিছুটা কম লাগলেও বাজারে পণ্যের চাহিদা না থাকায় উৎপাদন বাড়িয়ে লাভবান হওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয়দের মতে, আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের ব্যবহারের ধরনও বদলে গেছে। প্লাস্টিক ও ধাতব সামগ্রী তুলনামূলকভাবে টেকসই হওয়ায় ক্রেতারা সেদিকেই বেশি ঝুঁকছেন। অন্যদিকে মৃৎশিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ, পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে মাটির তৈরি পণ্য বিক্রি করে আগের মতো লাভ করা সম্ভব হচ্ছে না।
একসময় বালিয়াকান্দির বিভিন্ন হাট-বাজারে মাটির তৈরি পণ্যের আলাদা কদর ছিল। এখন বাজারগুলো জমজমাট থাকলেও সেখানে মৃৎশিল্পীদের উপস্থিতি অনেকটাই কমে গেছে। ফলে শুধু একটি পেশা নয়, এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ বাংলার একটি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও কারিগরি দক্ষতা।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, মৃৎশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি বাংলার প্রাচীন লোকঐতিহ্যের অংশ। এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে কারিগরদের আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহযোগিতা এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
তাদের মতে, আধুনিক নকশায় মাটির পণ্য তৈরি, অনলাইন ও পর্যটনকেন্দ্রিক বাজার সম্প্রসারণ এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে মৃৎশিল্পীদের তৈরি পণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রির ব্যবস্থা করা গেলে এ শিল্প নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে বালিয়াকান্দির ঐতিহ্যবাহী কুমারপাড়াগুলো একদিন শুধু স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে। মাটির সঙ্গে কয়েক পুরুষের যে সম্পর্ক, তা রক্ষা করতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং মানুষের সচেতন সহযোগিতা।
নইলে আধুনিকতার প্রবল স্রোতে হারিয়ে যাবে বালিয়াকান্দির মৃৎশিল্প, হারিয়ে যাবে মাটি দিয়ে মানুষের জীবন সাজানোর সেই চিরচেনা ঐতিহ্য।



















