জমিজমা বিরোধে সংঘর্ষে একজন নিহত,প্রতিপক্ষের বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর।
- প্রকাশ : ০২:২৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 6
জাতীয় সাপ্তাহিক অন্যায়ের প্রতিবাদ।
আক্কাস আলী খান রাজবাড়ী প্রতিনিধি।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বেথুলিয়া খোন্দকারপাড়ায় জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। হামলা ও সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর মঙ্গলবার সকালে প্রতিপক্ষের অন্তত আটটি বসতঘরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এখনও সেখানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
নিহত ব্যক্তি আতর আলী শেখ (৪২)। তিনি একই গ্রামের আইনুদ্দিন শেখের ছেলে।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার সকালে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে সৈয়দ শামসুল হক সূর্যের নেতৃত্বে ৪০-৫০ জনের একটি দল লাঠি, লোহার রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে আতর আলীর পরিবারের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা প্রথমে নতুন নির্মিত একটি টিনের ঘর ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় ঘরের ভেতরে থাকা কয়েকজন গুরুতর আহত হন। পরে পরিবারের অন্য সদস্যরা এগিয়ে এলে তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়।
এতে আতর আলীর পক্ষের অন্তত ১৬ জন আহত হন। আহতদের রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে গুরুতরদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সন্ধ্যায় আতর আলীর মৃত্যু হয়।
আতর আলীর মৃত্যুর পর মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টার দিকে প্রতিপক্ষের আফাজ উদ্দিন সরদার, নিফাজ উদ্দিন সরদার ও কামিন সরদারের বসতঘর, গোয়ালঘর ও রান্নাঘরসহ মোট আটটি ঘরে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে ঘরের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পুড়ে যায়।এছাড়া সিদ্দিক সরদার ও সাইদুর সরদারের বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। খবর পেয়ে রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এর আগেই অধিকাংশ টিনের বসতঘর, গরুর ঘর ও রান্নাঘর পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যায়।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া ঘরের স্থানে শুধু সিমেন্টের খুঁটি দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং অনেক জায়গা থেকে তখনও ধোঁয়া উঠছিল।নিফাজ ও আফাজ সরদারের বাবা মফিজ উদ্দিন বলেন, “বাড়িতে কেউ ছিল না। আমি বৃদ্ধ মানুষ, সকালে কারা এসে আমার ছেলেদের ঘরে আগুন দিয়েছে চিনতে পারিনি। আমার ছেলেরা সূর্যের কাছ থেকে জমি গিরফি নিয়ে চাষ করে। সেই জমি নিয়েই বিরোধ চলছে।”
অন্যদিকে নিহত আতর আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বামীর মৃত্যুশোকে ভেঙে পড়েছেন তার স্ত্রী। তাদের একমাত্র ছেলের বয়স প্রায় ১০ বছর; আরও দুই কন্যা সন্তান রয়েছে।
আতর আলীর চাচাতো বোন রিয়া খাতুন দাবি করেন, “জমিটি আমাদের পৈত্রিক সম্পত্তি। আদালতের মাধ্যমে আমরা জমির অধিকার পেয়েছি। কিন্তু প্রতিপক্ষ জোর করে দখলে রেখেছে। পরিকল্পিতভাবে হামলা করে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। মামলা দুর্বল করার জন্য তারাই নিজেদের ঘরে আগুন দিয়েছে।”
মূল অভিযুক্ত সৈয়দ শামসুল হক সূর্যের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
রাজবাড়ী ফায়ার স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা জানান, আগুনে আটটি ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোন্দকার জিয়াউর রহমান বলেন, নিহত আতর আলীর বড় ভাই রজব আলী বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অগ্নিসংযোগের ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
জানাগেছে, প্রায় ১৮ একর জমি নিয়ে একই গ্রামের সৈয়দ জাবেদ আলীর পরিবার এবং মৃত জলিল শেখের পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। স্বাধীনতার পর সৈয়দ জাবেদ আলী ওই জমিতে বসতি স্থাপন করেন। জলিল শেখের মৃত্যুর পর তার ছেলেরা পৈত্রিক সম্পত্তির দাবি করে প্রায় দুই মাস আগে সেখানে টিনের ঘর নির্মাণ করে বসবাস শুরু করলে বিরোধ নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করে। বিষয়টি আদালত ও থানায় গড়ায় এবং উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এই বিরোধের জের ধরেই সোমবারের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও পরদিন অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানান।










