মানবতার পাশে পীরগাছা বন্ধু-মহল, নীরব সেবায় দুই বছরে আলোর দিশারি।
- প্রকাশ : ১০:৫৪:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
- / 54
জাতীয় সাপ্তাহিক অন্যায়ের প্রতিবাদ।
পীরগাছা (রংপুর) প্রতিনিধি:
মানুষ মানুষের জন্য—এই চিরন্তন সত্যকে আবারও প্রমাণ করে চলেছে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন “পীরগাছা বন্ধু-মহল”। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে, নিভৃতে তারা গত দুই বছর ধরে সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সম্প্রতি সংগঠনটির মানবিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গুরুতর অসুস্থ মোকছেদ হোসেনের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হয়। মোকছেদ হোসেন পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তার পরিবারকে ছায়ার মতো আগলে রাখার যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তারই বাস্তব রূপ হিসেবে তার পরিবারের জন্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এক মাসের পূর্ণাঙ্গ বাজার—মাছ, মাংস, ডিমসহ প্রয়োজনীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য।
কেবল খাদ্য সহায়তাতেই থেমে থাকেনি “পীরগাছা বন্ধু-মহল”। অসুস্থতার কারণে পরিবারের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাতে কোনোভাবেই একটি শিশুর ভবিষ্যৎ থমকে না যায়, সে লক্ষ্যে মোকছেদ হোসেনের কন্যাসন্তানের লেখাপড়ার সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছে সংগঠনটি। এই সিদ্ধান্ত মানবিকতার গভীরতা ও দায়বদ্ধতার এক অনন্য উদাহরণ।
বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটির মুখে ছিল এক চিলতে হাসি। বাবার অসুস্থ শরীর, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সব কিছুর মাঝেও সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল, চোখে লুকানো ভয় আর ঠোঁটে লাজুক হাসি। তার সামনে সাজানো এক মাসের বাজার—চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ-মাংস—কিন্তু এসবের চেয়েও বড় প্রাপ্তি ছিল ভরসা। “পীরগাছা বন্ধু-মহল”-এর সদস্যরা যখন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, তখন সেই ছোট্ট চোখ দুটোয় ভর করে উঠল স্বপ্ন—পড়াশোনা থামবে না, জীবন থেমে যাবে না। একটি শিশুর মুখে ফিরে আসা এই হাসিই প্রমাণ করে, মানবিক সহায়তা কেবল পেট ভরায় না—এটি মনকে শক্ত করে, ভবিষ্যৎকে আলোকিত করে।
এদিকে মোকছেদ হোসেনের জীবনরক্ষাকারী অপারেশনের জন্য এখনও উল্লেখযোগ্য অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। এ অবস্থায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে সমাজের সামর্থ্যবান ও হৃদয়বান মানুষদের প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। কারণ, অনেক সময় কারও দেওয়া সামান্য সহায়তাই হয়ে ওঠে একজন মানুষের বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।
এই মানবিক অভিযাত্রায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন প্রবাসে অবস্থানরত পীরগাছার সন্তানেরা। নিজেদের সীমিত সামর্থ্য ও কষ্টার্জিত আয় থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তারা প্রমাণ করছেন—দেশ থেকে দূরে থাকলেও মানবিক দায়বদ্ধতা কখনো দূরে থাকে না। সংগঠনটির সদস্যরা প্রবাসীদের এই নিঃস্বার্থ অবদানকে তাদের কাজের প্রধান প্রেরণা হিসেবে দেখছেন।
“পীরগাছা বন্ধু-মহল” এখানেই থেমে নেই। তাদের পরবর্তী গন্তব্য তাম্বলপুর এলাকা, যেখানে অর্থাভাবে এক অসহায় বৃদ্ধা দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। সংগঠনটি তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
গত দুই বছরে সংগঠনটির মানবিক কার্যক্রমের পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে—অসহায় পরিবারগুলোর জন্য বিনামূল্যে নলকূপ স্থাপন, দরিদ্র মানুষের বসবাসের জন্য ঘর নির্মাণ ও সংস্কার, অসুস্থ ও দুস্থ পরিবারের জন্য এক মাসের বাজার সহায়তা প্রদান, চিকিৎসা ব্যয় ও ওষুধ সহায়তা এবং শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো।
কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত লাভের আশায় নয়—শুধু মানবতার দায়বদ্ধতা থেকেই এই সংগঠনের পথচলা। তাদের বিশ্বাস, সমাজে যদি কিছু মানুষ নিঃস্বার্থভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, তবে অসহায়ত্বের অন্ধকার ভেদ করেই আলো ছড়িয়ে পড়বে।
“পীরগাছা বন্ধু-মহল” আজ তাই কেবল একটি সংগঠনের নাম নয়; এটি মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক জীবন্ত প্রতীক।




















