০৭:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নারায়ণগঞ্জে গোপন ভোটের রহস্য: বিভাজন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে ১১ দলীয় জোট।

মোঃ আশরাফ আলী, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
  • প্রকাশ : ০১:২৮:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / 23

জাতীয় সাপ্তাহিক অন্যায়ের প্রতিবাদ।

মোঃ আশরাফ আলী, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:

আসন্ন জাতীয় ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে রাজনীতির মাঠ ক্রমেই কৌশলনির্ভর ও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। প্রকাশ্য স্লোগান বা শক্তির প্রদর্শনের চেয়ে এখানে এখন বেশি আলোচনায় নীরব ভোট, ভেতরের অস্বস্তি এবং কর্মী সমর্থকদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব।
বিএনপির বিভিন্ন আসনে মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে মাঠে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে এমন অনেক কর্মী ও সমর্থককে, যারা পূর্বে মনোনয়নবঞ্চিত বা বিরোধী বলয়ের নেতাদের অনুসারী ছিলেন। দলীয় স্বার্থে তারা মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিলেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থী ও কর্মীদের মধ্যে একটি অদৃশ্য দূরত্ব রয়ে যাচ্ছে।

কোথাও কোথাও মনোনীত প্রার্থী কর্মীদের প্রতি ‘সৎ ছেলের’ ভূমিকা নিচ্ছেন। এমন অনুভূতিও কর্মীদের মাঝে কাজ করছে, যা আন্তরিকতা ও উদ্দীপনায় প্রভাব ফেলছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত।অন্যদিকে, ১১ দলীয় জোটের ক্ষেত্রেও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের বাস্তব চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ ৩, আসনে ১১ দলীয় জোটের সমর্থিত ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থী মাওলানা শাহজাহান শিবলীকে জামায়াতের প্রার্থী ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়ার সব কর্মী সমর্থকের পূর্ণ সমর্থন পাইনি।

যদিও ডঃ ইকবাল এবং জামায়াতের জেলা ও মহানগর নেতৃত্ব সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে তিনি নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করবেন না। তবু মাঠপর্যায়ে তার একটি অংশের কর্মী নিজেদের উদ্যোগে আলাদা অবস্থান বজায় রাখছেন যা জোটের জন্য একটি নীরব নেতিবাচক ফ্যাক্টর হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।এছাড়া, সারাদেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও ১১ দলীয় জোটের নারী কর্মীদের প্রতি হেনস্থার একাধিক অভিযোগ সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। লিফলেট বিতরণ, গণসংযোগ ও প্রচারণার সময় নারীদের বাধা দেওয়ার ঘটনাগুলো ভোটারদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জে এবারের নির্বাচন কেবল প্রতীক বা স্লোগানের লড়াই নয়; এটি কর্মী সমর্থকদের মনস্তত্ত্ব, নীরব অসন্তোষ, ভোট বিভাজন এবং পরিচ্ছন্ন ইমেজের মধ্যকার এক জটিল সমীকরণ। এই বাস্তবতায় ১১ দলীয় জোটের ক্লিন ইমেজ যেমন একটি বড় শক্তি হয়ে উঠছে, তেমনি দলগুলোর ভেতরের এই সূক্ষ্ম দূরত্ব ও অসামঞ্জস্যই শেষ পর্যন্ত ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে এমনটাই মনে করেছেন স্থানীয় ভোটারগণ।নারায়ণগঞ্জ‑১ নারায়ণগঞ্জ ১, (রূপগঞ্জ)
রূপগঞ্জ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু (ধানের শীষ)।

রূপগঞ্জে একজন জনপ্রিয় তরুণ ত্যাগী নেতা ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য। দীপু ভূঁইয়া এবং তার কর্মী-সমর্থকগণ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে কাজ করে যাচ্ছেন। দীপু ভূঁইয়া সজ্জন, কর্মীবান্ধব ও জনবান্ধব হলেও বিএনপির কর্মী পরিচয়ে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার অভিযোগ রয়েছে।স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. দুলাল জাহাজ মার্কায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া জামায়াত মনোনীত ও দশ দলীয় জোটের সমর্থিত প্রার্থী মোঃ আনোয়ার হোসেন মোল্লা (দাঁড়িপাল্লা) ও তার কর্মীরা সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছেন।

নির্বাচনী পরিবেশ সংবেদনশীল। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জামায়াত কার্যালয়ের সামনে বালু ও ইট ফেলে চলাচলে বাধা, অফিস বন্ধ করার হুমকি, মহিলা কর্মীদের লিফলেট বিতরণে বাধা এবং প্রচারণা কার্যক্রমে নিরুৎসাহিত করার ঘটনা ঘটেছে। ভোটারদের মধ্যে এই সন্ত্রাসী ও হুমকিপূর্ণ পরিস্থিতি প্রকাশ্য সমর্থনকে সীমিত করেছে।

নীরব ভোটের ফ্যাক্টর এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভোটাররা অতীতের রাজনৈতিক আচরণ ও বিতর্কের আলোকে নিজের সিদ্ধান্ত গোপন রাখছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী দুলালের স্থানীয় কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর ধানের শীষের ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।একই সঙ্গে জামায়াত মনোনীত ও দশ দলীয় জোটের কার্যক্রম নিরবভাবে জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে। সরাসরি জনসংযোগ এবং স্থানীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এই আসনে নির্বাচনী সমীকরণকে জটিল করেছে।

ভোটারদের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে যে ধানের শীষের প্রতীক এবং দাঁড়িপাল্লার প্রতীক রূপগঞ্জে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে; জয়ের মালা কার গলায় তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা মুশকিল।
রূপগঞ্জে অন্যান্য প্রার্থী ও তাদের প্রতীক –
ওয়াসিম উদ্দিন গণঅধিকার পরিষদ ট্রাক
মো. মনিরুজ্জামান চন্দন সিপিবি কাস্তে
মো. ইমদাদুল্লাহ ইসলামী আন্দোলন হাতপাখা
মো. রেহান আফজাল ইনসানিয়াত বিপ্লব কলম
সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, রূপগঞ্জে জোট সমর্থিত প্রার্থীর সুযোগ বাড়ছে, কারণ বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোট ব্যাংক বিভাজিত। পাশাপাশি ভোটারদের মধ্যে নীরবতা থাকায় শেষ পর্যন্ত গোপন ব্যালটই বিজয়ের চূড়ান্ত ফ্যাক্টর হবে
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার)

আড়াইহাজারে নির্বাচন সবচেয়ে কৌশলনির্ভর। স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান আঙ্গুর তিন বারের সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ায় তার নিজস্ব ভোট ব্যাংক এখনও শক্তিশালী। বিএনপি মনোনীত নজরুল ইসলাম আজাদও উল্লেখযোগ্য সমর্থন পাবেন, তবে তার দীর্ঘদিনের অপকর্ম, কমিটি বাণিজ্য এবং হিংসাত্মক ইতিহাস ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নারায়ণগঞ্জে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের পাশে তাকে মঞ্চে চেয়ারবিহীন বসতে না দেওয়ায় তার অবস্থান জনমনে দূর্বল হয়েছে।

জামায়াত মনোনীত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অধ্যাপক ইলিয়াস মোল্লা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচনে জয়লাভ করে, স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তার ভোটব্যাংক রয়েছে আড়াইহাজার পশ্চিম অংশে। সম্প্রতি তাঁর গণসংযোগে আজাদ বাহিনীর হামলা, ব্যানার ও ফেস্টুন ছিড়ে ফেলা, নারী কর্মীদের লাঞ্ছনা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের হুমকি এই আসনে ভোটারদের প্রকাশ্য সমর্থনকে সীমিত করেছে। তবে নীরব ভোটের আড়ালে একটি বড় অংশ অধ্যাপক ইলিয়াস মোল্লার দিকে ঝুঁকছে।

এছাড়া অন্যান্য অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা হলেন হাফিজুল ইসলাম (সিপিবি), মাওলানা হাবিবুল্লাহ (ইসলামী আন্দোলন)।
এখানে ভোটাররা বিবেচনা করছেন প্রার্থীর সংগঠন দক্ষতা, স্বচ্ছ ইমেজ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। ইলিয়াস মোল্লার ইতিবাচক ইমেজ ও জোটগত সমর্থন তাকে শক্ত অবস্থানে রাখছে।ভোটাররা মনে করছেন, আড়াইহাজারে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন, আতঙ্ক ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড জামায়াত জোট সমর্থিত প্রার্থীর জন্য সুবিধাজনক। এছাড়া স্থানীয় জনগণ নিরাপদ, শান্তিপ্রিয় ভোটপ্রক্রিয়া চাইছে, যা জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীকে আরও সুবিধা দিচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও)
সোনারগাঁ আসনে ভোটের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান (ধানের শীষ) মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তাঁর বিপরীতে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম (ঘোড়া) ও মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন (ফুটবল)—উভয়েই সাবেক সংসদ সদস্য। এ দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির উপস্থিতির কারণে বিএনপির ভোটব্যাংক স্পষ্টভাবেই বিভাজনের মুখে পড়েছে।

এছাড়াও ছোট দল ও অন্যান্য স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন অঞ্জন দাস (গণসংহতি আন্দোলন—মাথাল), গোলাম মসীহ (ইসলামী আন্দোলন—হাতপাখা) এবং মো. ওয়াহিদুর রহমান মিল্কী (গণঅধিকার পরিষদ—ট্রাক), যারা সীমিত হলেও ভোটের সমীকরণে প্রভাব রাখছেন।
নির্বাচনে সবচেয়ে নাটকীয় মোড় আসে ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া (দাঁড়িপাল্লা) ও মাওলানা শাহজাহান শিবলী (রিক্সা)কে ঘিরে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আসন ভাগাভাগির প্রাথমিক পরিকল্পনায় ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়াকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত থাকলেও, চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে সরে গেলে পরিস্থিতি বদলে যায়। সে প্রেক্ষাপটে আসনটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থী মাওলানা শাহজাহান শিবলীর জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে জামায়াত ও ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে সোনারগাঁ আসনে ডঃ ইকবালের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও শক্ত ভোটব্যাংকের কারণে তাঁর সমর্থকরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রচার চালিয়ে যেতে থাকেন। ফলে শিবলী মাঠ গোছাতে ব্যর্থ হন।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অবশেষে ১১ দলীয় জোট নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়। মাওলানা মামুনুল হকের দলের প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিয়ে ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়াকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়। সময় স্বল্প হলেও তাঁর মাঠ প্রস্তুত ছিল, ভোটারদের মধ্যে ছিল তীব্র আবেগ ও উৎসাহ। জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হওয়ায় দলীয় নির্দেশনার সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করেই তাঁর পক্ষে ব্যাপক প্রচার চলতে থাকে।
বর্তমানে ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত এবং ১১ দলীয় জোটের সমর্থিত প্রার্থী

হিসেবে কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ভোট বিভাজনের সুযোগে জোটসমর্থিত প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাবনা দিন দিন আরও দৃশ্যমান হচ্ছে।এ কারণে ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের নির্বাচনকে ঘিরে শুধু সোনারগাঁ নয়, নারায়ণগঞ্জের সব আসনের ভোটারদের নজর এখন এই আসনের দিকেই।

নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ)
ফতুল্লা আসনকে ঘিরে আলোচনা সবচেয়ে তীব্র। এই আসনে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মো. শাহ আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী (হরিণ) এবং মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী (ফুটবল) হিসেবে মাঠে থাকায় বিএনপির ভোট ব্যাংক বড় ধরনের চাপে পড়েছে। এছাড়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলামী বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমী (বিএনপি জোট — খেজুর গাছ)-কে বিএনপির নেতা এবং ভক্তসমর্থকগণ মেনে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে।

মনিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে, তার ডানে-বামে শামীম ওসমানের লোক রয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিভিন্নভাবে সমালোচিত হয়েছেন; সর্বশেষ একটি অনুষ্ঠানে পুরস্কার হিসেবে প্লেট বিতরণের আড়ালে টাকা বিতরণের দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে এবং সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।এর বিপরীতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সমর্থিত প্রার্থী, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ও বিশেষ মুখপত্র অ্যাডভোকেট আল আলামিন (শাপলা কলি)

সুসংগঠিত অবস্থানে রয়েছেন। স্থানীয় ভোটাররা জানান, আল আলামিন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা শুধু ফতুল্লা অঞ্চলে নয়, নারায়ণগঞ্জ জেলা এবং দেশব্যাপী ব্যাপক। এজন্য তার জয় যেন শুধুই সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
স্থানীয়ভাবে আলোচিত বিষয় হলো, জামায়াতের প্রভাবশালী নেতা মাওলানা আব্দুল জব্বার মাঠ গুছিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন এবং জোটগত সমঝোতার স্বার্থে তিনি নিজের সেই অবস্থান আল আলামিনের পক্ষে একীভূত করেছেন। তার আহ্বান—“ফতুল্লায় শাপলা কলির মধ্যেই দাঁড়িপাল্লার অবস্থান খুঁজে নিতে”—মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্য প্রার্থীরা হলেন: সেলিম মাহমুদ (বাসদ — মই), মো. আরিফ ভূঁইয়া (গণঅধিকার পরিষদ — ট্রাক), ইকবাল হোসেন (সিপিবি — কাস্তে), মুফতি ইসমাইল কাউসার (ইসলামী আন্দোলন — হাতপাখা), সালাউদ্দিন খোকা মোল্লা (জাতীয় পার্টি — লাঙ্গল), মোহাম্মদ আলী (হাতি মার্কা)। এই প্রার্থীদের সক্রিয় প্রচারণা এবং ভোটারদের উপর প্রভাবও আসনের প্রতিযোগিতা তীব্র করছে।

নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর)
সদর-বন্দর আসনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে জটিল। এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবুল কালাম (ধানের শীষ) থাকলেও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন (স্বতন্ত্র — ফুটবল) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় বিএনপির ভোট ব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অপরদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সমর্থিত, খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন (দেয়াল ঘড়ি) সম্ভাবনাময় অবস্থানে রয়েছেন। দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, ক্লিন ইমেজ এবং বিভিন্ন ইসলামী ও বিরোধী

রাজনৈতিক দলের সমর্থন তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হিসেবে দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, মহানগর ও ১১ দলীয় লিয়াজো কমিটি এবং খেলাফত মজলিস নেতাকর্মীদের সক্রিয় সমর্থন তাকে জয়ের সম্ভাবনায় শক্তিশালী করেছে। উল্লেখ্য, প্রাথমিকভাবে মাওলানা মাঈনুদ্দিন এই আসনের শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু আসন ভাগাভাগির কারণে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও প্রতিযোগিতায় রয়েছেন এবং ভোট বিভাজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তারা হলেন: মুফতি মাসুম বিল্লাহ (ইসলামী আন্দোলন — হাতপাখা), তরিকুল ইসলাম সুজন (গণসংহতি আন্দোলন — মাথাল), মন্টু চন্দ্র ঘোষ (সিপিবি — কাস্তে), আবু নাঈম খান বিপ্লব (বাসদ — মই) এবং নাহিদ হোসেন (গণঅধিকার পরিষদ — ট্রাক)।
ভোটাররা মনে করছেন, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ভোট বিভাজনের কারণে জোট সমর্থিত এবিএম সিরাজুল মামুনের বিজয় সম্ভাবনা সবচেয়ে উজ্জ্বল। ফলে নির্বাচনী লড়াই কঠিন হলেও জোটের সুসংগঠিত প্রচারণা এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সমর্থন তাকে এগিয়ে রেখেছে। ভোটাভুটি ও ফলাফলের দিকে জেলার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজর এখন প্রধানত সিরাজুল মামুনের অবস্থানে কেন্দ্রীভূত।

Please Share This Post in Your Social Media

নারায়ণগঞ্জে গোপন ভোটের রহস্য: বিভাজন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে ১১ দলীয় জোট।

প্রকাশ : ০১:২৮:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জাতীয় সাপ্তাহিক অন্যায়ের প্রতিবাদ।

মোঃ আশরাফ আলী, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:

আসন্ন জাতীয় ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে রাজনীতির মাঠ ক্রমেই কৌশলনির্ভর ও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। প্রকাশ্য স্লোগান বা শক্তির প্রদর্শনের চেয়ে এখানে এখন বেশি আলোচনায় নীরব ভোট, ভেতরের অস্বস্তি এবং কর্মী সমর্থকদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব।
বিএনপির বিভিন্ন আসনে মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে মাঠে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে এমন অনেক কর্মী ও সমর্থককে, যারা পূর্বে মনোনয়নবঞ্চিত বা বিরোধী বলয়ের নেতাদের অনুসারী ছিলেন। দলীয় স্বার্থে তারা মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিলেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থী ও কর্মীদের মধ্যে একটি অদৃশ্য দূরত্ব রয়ে যাচ্ছে।

কোথাও কোথাও মনোনীত প্রার্থী কর্মীদের প্রতি ‘সৎ ছেলের’ ভূমিকা নিচ্ছেন। এমন অনুভূতিও কর্মীদের মাঝে কাজ করছে, যা আন্তরিকতা ও উদ্দীপনায় প্রভাব ফেলছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত।অন্যদিকে, ১১ দলীয় জোটের ক্ষেত্রেও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের বাস্তব চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ ৩, আসনে ১১ দলীয় জোটের সমর্থিত ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থী মাওলানা শাহজাহান শিবলীকে জামায়াতের প্রার্থী ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়ার সব কর্মী সমর্থকের পূর্ণ সমর্থন পাইনি।

যদিও ডঃ ইকবাল এবং জামায়াতের জেলা ও মহানগর নেতৃত্ব সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে তিনি নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করবেন না। তবু মাঠপর্যায়ে তার একটি অংশের কর্মী নিজেদের উদ্যোগে আলাদা অবস্থান বজায় রাখছেন যা জোটের জন্য একটি নীরব নেতিবাচক ফ্যাক্টর হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।এছাড়া, সারাদেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও ১১ দলীয় জোটের নারী কর্মীদের প্রতি হেনস্থার একাধিক অভিযোগ সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। লিফলেট বিতরণ, গণসংযোগ ও প্রচারণার সময় নারীদের বাধা দেওয়ার ঘটনাগুলো ভোটারদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জে এবারের নির্বাচন কেবল প্রতীক বা স্লোগানের লড়াই নয়; এটি কর্মী সমর্থকদের মনস্তত্ত্ব, নীরব অসন্তোষ, ভোট বিভাজন এবং পরিচ্ছন্ন ইমেজের মধ্যকার এক জটিল সমীকরণ। এই বাস্তবতায় ১১ দলীয় জোটের ক্লিন ইমেজ যেমন একটি বড় শক্তি হয়ে উঠছে, তেমনি দলগুলোর ভেতরের এই সূক্ষ্ম দূরত্ব ও অসামঞ্জস্যই শেষ পর্যন্ত ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে এমনটাই মনে করেছেন স্থানীয় ভোটারগণ।নারায়ণগঞ্জ‑১ নারায়ণগঞ্জ ১, (রূপগঞ্জ)
রূপগঞ্জ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু (ধানের শীষ)।

রূপগঞ্জে একজন জনপ্রিয় তরুণ ত্যাগী নেতা ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য। দীপু ভূঁইয়া এবং তার কর্মী-সমর্থকগণ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে কাজ করে যাচ্ছেন। দীপু ভূঁইয়া সজ্জন, কর্মীবান্ধব ও জনবান্ধব হলেও বিএনপির কর্মী পরিচয়ে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার অভিযোগ রয়েছে।স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. দুলাল জাহাজ মার্কায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া জামায়াত মনোনীত ও দশ দলীয় জোটের সমর্থিত প্রার্থী মোঃ আনোয়ার হোসেন মোল্লা (দাঁড়িপাল্লা) ও তার কর্মীরা সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছেন।

নির্বাচনী পরিবেশ সংবেদনশীল। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জামায়াত কার্যালয়ের সামনে বালু ও ইট ফেলে চলাচলে বাধা, অফিস বন্ধ করার হুমকি, মহিলা কর্মীদের লিফলেট বিতরণে বাধা এবং প্রচারণা কার্যক্রমে নিরুৎসাহিত করার ঘটনা ঘটেছে। ভোটারদের মধ্যে এই সন্ত্রাসী ও হুমকিপূর্ণ পরিস্থিতি প্রকাশ্য সমর্থনকে সীমিত করেছে।

নীরব ভোটের ফ্যাক্টর এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভোটাররা অতীতের রাজনৈতিক আচরণ ও বিতর্কের আলোকে নিজের সিদ্ধান্ত গোপন রাখছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী দুলালের স্থানীয় কর্মী সমর্থকদের সঙ্গে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর ধানের শীষের ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।একই সঙ্গে জামায়াত মনোনীত ও দশ দলীয় জোটের কার্যক্রম নিরবভাবে জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে। সরাসরি জনসংযোগ এবং স্থানীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এই আসনে নির্বাচনী সমীকরণকে জটিল করেছে।

ভোটারদের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে যে ধানের শীষের প্রতীক এবং দাঁড়িপাল্লার প্রতীক রূপগঞ্জে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে; জয়ের মালা কার গলায় তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা মুশকিল।
রূপগঞ্জে অন্যান্য প্রার্থী ও তাদের প্রতীক –
ওয়াসিম উদ্দিন গণঅধিকার পরিষদ ট্রাক
মো. মনিরুজ্জামান চন্দন সিপিবি কাস্তে
মো. ইমদাদুল্লাহ ইসলামী আন্দোলন হাতপাখা
মো. রেহান আফজাল ইনসানিয়াত বিপ্লব কলম
সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, রূপগঞ্জে জোট সমর্থিত প্রার্থীর সুযোগ বাড়ছে, কারণ বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোট ব্যাংক বিভাজিত। পাশাপাশি ভোটারদের মধ্যে নীরবতা থাকায় শেষ পর্যন্ত গোপন ব্যালটই বিজয়ের চূড়ান্ত ফ্যাক্টর হবে
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার)

আড়াইহাজারে নির্বাচন সবচেয়ে কৌশলনির্ভর। স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান আঙ্গুর তিন বারের সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ায় তার নিজস্ব ভোট ব্যাংক এখনও শক্তিশালী। বিএনপি মনোনীত নজরুল ইসলাম আজাদও উল্লেখযোগ্য সমর্থন পাবেন, তবে তার দীর্ঘদিনের অপকর্ম, কমিটি বাণিজ্য এবং হিংসাত্মক ইতিহাস ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নারায়ণগঞ্জে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের পাশে তাকে মঞ্চে চেয়ারবিহীন বসতে না দেওয়ায় তার অবস্থান জনমনে দূর্বল হয়েছে।

জামায়াত মনোনীত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অধ্যাপক ইলিয়াস মোল্লা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচনে জয়লাভ করে, স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তার ভোটব্যাংক রয়েছে আড়াইহাজার পশ্চিম অংশে। সম্প্রতি তাঁর গণসংযোগে আজাদ বাহিনীর হামলা, ব্যানার ও ফেস্টুন ছিড়ে ফেলা, নারী কর্মীদের লাঞ্ছনা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের হুমকি এই আসনে ভোটারদের প্রকাশ্য সমর্থনকে সীমিত করেছে। তবে নীরব ভোটের আড়ালে একটি বড় অংশ অধ্যাপক ইলিয়াস মোল্লার দিকে ঝুঁকছে।

এছাড়া অন্যান্য অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা হলেন হাফিজুল ইসলাম (সিপিবি), মাওলানা হাবিবুল্লাহ (ইসলামী আন্দোলন)।
এখানে ভোটাররা বিবেচনা করছেন প্রার্থীর সংগঠন দক্ষতা, স্বচ্ছ ইমেজ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। ইলিয়াস মোল্লার ইতিবাচক ইমেজ ও জোটগত সমর্থন তাকে শক্ত অবস্থানে রাখছে।ভোটাররা মনে করছেন, আড়াইহাজারে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন, আতঙ্ক ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড জামায়াত জোট সমর্থিত প্রার্থীর জন্য সুবিধাজনক। এছাড়া স্থানীয় জনগণ নিরাপদ, শান্তিপ্রিয় ভোটপ্রক্রিয়া চাইছে, যা জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীকে আরও সুবিধা দিচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও)
সোনারগাঁ আসনে ভোটের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান (ধানের শীষ) মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তাঁর বিপরীতে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম (ঘোড়া) ও মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন (ফুটবল)—উভয়েই সাবেক সংসদ সদস্য। এ দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির উপস্থিতির কারণে বিএনপির ভোটব্যাংক স্পষ্টভাবেই বিভাজনের মুখে পড়েছে।

এছাড়াও ছোট দল ও অন্যান্য স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন অঞ্জন দাস (গণসংহতি আন্দোলন—মাথাল), গোলাম মসীহ (ইসলামী আন্দোলন—হাতপাখা) এবং মো. ওয়াহিদুর রহমান মিল্কী (গণঅধিকার পরিষদ—ট্রাক), যারা সীমিত হলেও ভোটের সমীকরণে প্রভাব রাখছেন।
নির্বাচনে সবচেয়ে নাটকীয় মোড় আসে ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া (দাঁড়িপাল্লা) ও মাওলানা শাহজাহান শিবলী (রিক্সা)কে ঘিরে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আসন ভাগাভাগির প্রাথমিক পরিকল্পনায় ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়াকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত থাকলেও, চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে সরে গেলে পরিস্থিতি বদলে যায়। সে প্রেক্ষাপটে আসনটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থী মাওলানা শাহজাহান শিবলীর জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে জামায়াত ও ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে সোনারগাঁ আসনে ডঃ ইকবালের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও শক্ত ভোটব্যাংকের কারণে তাঁর সমর্থকরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রচার চালিয়ে যেতে থাকেন। ফলে শিবলী মাঠ গোছাতে ব্যর্থ হন।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অবশেষে ১১ দলীয় জোট নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়। মাওলানা মামুনুল হকের দলের প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিয়ে ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়াকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়। সময় স্বল্প হলেও তাঁর মাঠ প্রস্তুত ছিল, ভোটারদের মধ্যে ছিল তীব্র আবেগ ও উৎসাহ। জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হওয়ায় দলীয় নির্দেশনার সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করেই তাঁর পক্ষে ব্যাপক প্রচার চলতে থাকে।
বর্তমানে ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত এবং ১১ দলীয় জোটের সমর্থিত প্রার্থী

হিসেবে কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ভোট বিভাজনের সুযোগে জোটসমর্থিত প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাবনা দিন দিন আরও দৃশ্যমান হচ্ছে।এ কারণে ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের নির্বাচনকে ঘিরে শুধু সোনারগাঁ নয়, নারায়ণগঞ্জের সব আসনের ভোটারদের নজর এখন এই আসনের দিকেই।

নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ)
ফতুল্লা আসনকে ঘিরে আলোচনা সবচেয়ে তীব্র। এই আসনে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মো. শাহ আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী (হরিণ) এবং মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী (ফুটবল) হিসেবে মাঠে থাকায় বিএনপির ভোট ব্যাংক বড় ধরনের চাপে পড়েছে। এছাড়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলামী বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমী (বিএনপি জোট — খেজুর গাছ)-কে বিএনপির নেতা এবং ভক্তসমর্থকগণ মেনে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে।

মনিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে, তার ডানে-বামে শামীম ওসমানের লোক রয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি বিভিন্নভাবে সমালোচিত হয়েছেন; সর্বশেষ একটি অনুষ্ঠানে পুরস্কার হিসেবে প্লেট বিতরণের আড়ালে টাকা বিতরণের দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে এবং সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।এর বিপরীতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সমর্থিত প্রার্থী, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ও বিশেষ মুখপত্র অ্যাডভোকেট আল আলামিন (শাপলা কলি)

সুসংগঠিত অবস্থানে রয়েছেন। স্থানীয় ভোটাররা জানান, আল আলামিন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা শুধু ফতুল্লা অঞ্চলে নয়, নারায়ণগঞ্জ জেলা এবং দেশব্যাপী ব্যাপক। এজন্য তার জয় যেন শুধুই সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
স্থানীয়ভাবে আলোচিত বিষয় হলো, জামায়াতের প্রভাবশালী নেতা মাওলানা আব্দুল জব্বার মাঠ গুছিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন এবং জোটগত সমঝোতার স্বার্থে তিনি নিজের সেই অবস্থান আল আলামিনের পক্ষে একীভূত করেছেন। তার আহ্বান—“ফতুল্লায় শাপলা কলির মধ্যেই দাঁড়িপাল্লার অবস্থান খুঁজে নিতে”—মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্য প্রার্থীরা হলেন: সেলিম মাহমুদ (বাসদ — মই), মো. আরিফ ভূঁইয়া (গণঅধিকার পরিষদ — ট্রাক), ইকবাল হোসেন (সিপিবি — কাস্তে), মুফতি ইসমাইল কাউসার (ইসলামী আন্দোলন — হাতপাখা), সালাউদ্দিন খোকা মোল্লা (জাতীয় পার্টি — লাঙ্গল), মোহাম্মদ আলী (হাতি মার্কা)। এই প্রার্থীদের সক্রিয় প্রচারণা এবং ভোটারদের উপর প্রভাবও আসনের প্রতিযোগিতা তীব্র করছে।

নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর)
সদর-বন্দর আসনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে জটিল। এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবুল কালাম (ধানের শীষ) থাকলেও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন (স্বতন্ত্র — ফুটবল) স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় বিএনপির ভোট ব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অপরদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সমর্থিত, খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন (দেয়াল ঘড়ি) সম্ভাবনাময় অবস্থানে রয়েছেন। দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, ক্লিন ইমেজ এবং বিভিন্ন ইসলামী ও বিরোধী

রাজনৈতিক দলের সমর্থন তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হিসেবে দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী, মহানগর ও ১১ দলীয় লিয়াজো কমিটি এবং খেলাফত মজলিস নেতাকর্মীদের সক্রিয় সমর্থন তাকে জয়ের সম্ভাবনায় শক্তিশালী করেছে। উল্লেখ্য, প্রাথমিকভাবে মাওলানা মাঈনুদ্দিন এই আসনের শক্তিশালী প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু আসন ভাগাভাগির কারণে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও প্রতিযোগিতায় রয়েছেন এবং ভোট বিভাজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তারা হলেন: মুফতি মাসুম বিল্লাহ (ইসলামী আন্দোলন — হাতপাখা), তরিকুল ইসলাম সুজন (গণসংহতি আন্দোলন — মাথাল), মন্টু চন্দ্র ঘোষ (সিপিবি — কাস্তে), আবু নাঈম খান বিপ্লব (বাসদ — মই) এবং নাহিদ হোসেন (গণঅধিকার পরিষদ — ট্রাক)।
ভোটাররা মনে করছেন, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ভোট বিভাজনের কারণে জোট সমর্থিত এবিএম সিরাজুল মামুনের বিজয় সম্ভাবনা সবচেয়ে উজ্জ্বল। ফলে নির্বাচনী লড়াই কঠিন হলেও জোটের সুসংগঠিত প্রচারণা এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সমর্থন তাকে এগিয়ে রেখেছে। ভোটাভুটি ও ফলাফলের দিকে জেলার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজর এখন প্রধানত সিরাজুল মামুনের অবস্থানে কেন্দ্রীভূত।